কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় বেরিয়ে আসা গ্যাসে জ্বলে ওঠা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও আজ বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দল কারিগরি কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
এদিকে আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে প্রায় চার হাজার পরিবারসহ হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার সকালে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোট খাল সেতুসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর বসতভিটায় গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। এ সময় গর্ত থেকে দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস বের হতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে আগুন জ্বলে ওঠে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট কাজ করছে। তবে গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্স, পেট্রোবাংলা ও ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, গভীর নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ভূগর্ভের ফাটল দিয়ে গ্যাস ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে। তবে নমুনা পরীক্ষা ছাড়া গ্যাসের প্রকৃতি ও উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, আগুনের রং ও ধোঁয়া দেখে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
নাফিফুন আরহাম আরও বলেন, গ্যাস নির্গমন বন্ধ করতে গেলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে তা বেরিয়ে এসে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ কারণে আপাতত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি জানতে নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
আগুনের ঝুঁকি এড়াতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার পাশাপাশি বিকল্প সংযোগ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক কাইজার নুর বলেন, বাপেক্সের পরামর্শ অনুযায়ী বিকল্প সংযোগ স্থাপনের কাজ চলছে। যত দ্রুত সম্ভব বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে আগুনের শিখা ও গ্যাসের গন্ধ নিয়ে তাঁরা উদ্বেগে রয়েছেন। আগুনের উৎসের কাছাকাছি একটি পাঁচ তারকা হোটেলে কর্মরত মোহাম্মদ আলামিন বলেন, ওই এলাকার একটি কক্ষে কয়েকজন হোটেলকর্মী থাকেন। হঠাৎ এভাবে আগুন জ্বলতে দেখে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, আগুন কখন নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎবিহীন এলাকায় বিকল্প সংযোগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে আতঙ্কিত না হয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বেরিয়ে আসার ঘটনায় কক্সবাজার উপকূলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তোফায়েল আহমদ বলেন, পাকিস্তান আমলেও ইনানী এলাকায় তেল-গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তবে তা উত্তোলনের বিষয়ে তখন সিদ্ধান্ত হয়নি। এবার সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও সমুদ্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনা রয়েছে। কক্সবাজার উপকূলেও এমন সম্ভাবনা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে ইনানীর ঘটনায় বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত রয়েছে কি না, তা নমুনা বিশ্লেষণ ও ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়নের পরই বোঝা যাবে।