সকাল থেকে কখনো টিপটিপ, কখনো ঝুম বৃষ্টি। কিছুক্ষণ পরই মেঘ সরিয়ে উঁকি দেয় রোদ। আবার বিকেলের দিকে নেমে আসে বৃষ্টির ঝাপটা। বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমুদ্রও যেন বিশাল ঢেউ তুলে নেচে চলেছে। বর্ষার এই চিরচেনা রূপের মধ্যেই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের শৈবাল পয়েন্টসংলগ্ন ঝাউবনজুড়ে ছিল অন্যরকম এক প্রাণচাঞ্চল্য। সেখানে চলছে রাখাইন সম্প্রদায়ের শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী বর্ষা উৎসব।
আজ শুক্রবার বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ঝাউবনের ছায়ায় ছোট ছোট দলে জড়ো হতে থাকেন রাখাইন নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও শিশুরা। কেউ গল্পে মগ্ন, কেউ গান ধরেছেন, কেউ আবার সমুদ্রের ঢেউকে পেছনে রেখে ছবি তুলছেন। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়টাই উৎসবের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
শুধু রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষই নন, সৈকতে ঘুরতে আসা দেশি পর্যটকদের অনেকেও কৌতূহল নিয়ে এই আয়োজনে ভিড় করেন। কেউ দূর থেকে গান-আড্ডা উপভোগ করেন, কেউ রাখাইনদের সঙ্গে ছবি তোলেন, আবার কেউ তাদের সংস্কৃতি ও এই উৎসবের ইতিহাস জানার আগ্রহ দেখান। ফলে সৈকতের একাংশে তৈরি হয় ভিন্নধর্মী এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
উৎসবে অংশ নেওয়া কক্সবাজার শহরের ফুলবাগের নীলা রাখাইন জানান, বছরের এই সময়টুকু তাদের কাছে কেবল আনন্দের নয়, মিলনমেলারও। কর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয় এই উৎসবকে ঘিরেই। তাই বর্ষায় সমুদ্রসৈকতের এই আয়োজন তাদের জন্য বিশেষ অর্থ বহন করে।
শহরের পেশকার পাড়ার ক্যংগ্রি রাখাইন জানান, `আগামী সপ্তাহে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপনী হবে। শেষ দিনের আয়োজনকে ঘিরে বিভিন্ন জেলা থেকে আরও বেশি মানুষ সমুদ্রসৈকতে সমবেত হবেন আশা করা যাচ্ছে।'
রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রবীণদের ভাষ্যমতে, আষাঢ়ী পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বর্ষা উৎসব তিন মাস ধরে চলে। প্রতি বছর বর্ষাকালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ঝাউবনে সম্প্রদায়ের সদস্যরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে একত্রিত হন। প্রকৃতির সান্নিধ্যে গান, আড্ডা, পারিবারিক মিলন এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে তারা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
বর্ষার মেঘ, সমুদ্রের গর্জন আর ঝাউবনের মৃদু হাওয়ার সঙ্গে মিলেমিশে রাখাইনদের এই উৎসব কক্সবাজারের বর্ষাকালের এক অনন্য সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।
রামু থেকে উৎসব দেখতে এসেছেন বজলুর সাত্তার। তিনি জানান, `রাখাইনদের বর্ষা উৎসব অত্যন্ত প্রাণবন্ত। প্রতিবছর কোনো এক সপ্তাহে এই উৎসবে যোগ দিই।'
এদিকে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সৈকতে পর্যটকের ভিড় দেখা গেছে। বিকেলে সৈকতের লাবণি পয়েন্টে টর্নেডো ঝড় তৈরি হয়। সৈকতের শৈবাল থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত তিন কিলোমিটার সৈকতে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার পর্যটক সমুদ্র দর্শনে নেমেছেন বলে জানিয়েছেন সৈকতের বিচকর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুব আলম।
তিনি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে সাগর উত্তাল রয়েছে। সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত চলছে। এর ফলে সাগরে গোসলে নামা থেকে বিরত থাকতে পর্যটকদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
সি সেফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার মোহাম্মদ ওসমান গনি জানান, পর্যটকদের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে সার্বক্ষনিক নজরদারি করা হয়। কেউ গোসলে নেমে বিপদে পড়লে তাৎক্ষণিক উদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।