হাড়ভাঙা খাটুনি আর ধারদেনা করে ফলানো সোনার ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের কৃষকেরা।
ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পুনর্ভবা নদী দিয়ে আছড়ে পড়ায় বিলের পর বিল প্লাবিত হচ্ছে। সীমান্তবর্তী বিল তিলনা, তিলকুচ, সুখডোবা ও গুমরোহিল বিলের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে এখন কেবলই হাহাকার। আধাপাকা ধানটুকু অন্তত যেন গোলায় তোলা যায়, সেই প্রান্তিক চাষিরা।
ঈশ্বরপুরগঞ্জ ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শত শত কৃষক কোমর বেঁধে কাজ করছেন। ভারতের উজান থেকে আসা পানির তীব্র স্রোত বিলে ঢোকা ঠেকাতে ভেকু (মাটি কাটার যন্ত্র) দিয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে অস্থায়ী মাটির বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ; যদি এই বাঁধ কোনোভাবে ভেঙে যায়, তবে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিলের সব ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাবে।
পানির এই আকস্মিক বৃদ্ধির সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রমিক সংকট। এলাকার অধিকাংশ কৃষক এখন একসঙ্গে ধান কাটার চেষ্টা করায় শ্রমিকের চাহিদা আকাশচুম্বী।
কৃষক বাবর আলী বলেন, ‘এক বিঘা জমির ধান কোনোমতে বাড়িতে এনেছি। ১৫ বিঘা জমির ধান কাটার পর জমিতেই পড়ে আছে। এখন জনপ্রতি ১ হাজার টাকা করে শ্রমিক ঠিক করেছি। এরপর আছে নৌকা ভাড়া। খেত থেকে ধান নৌকায় করে আনতে এখন স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে লাভের আশা ছেড়ে দিয়ে এখন শুধু পুঁজিটুকু বাঁচানোর চেষ্টা করছি।’
তিন ভাই মিলে ২৫ বিঘা জমিতে আবাদ করা কৃষক আলমগীর বলেন, ‘আমার ধানগুলো এখনো পুরো পাকেনি। কিন্তু পানির ভয়ে ৫ বিঘা জমির আধাপাকা ধানই কাটতে হয়েছে। বাকিগুলো কাটার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে পানির ভয়, অন্যদিকে কামলার সংকট—আমাদের মরণদশা।’
কৃষক আজম ফারুকের কণ্ঠে ঝরে পড়ল পুরোনো দিনের আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘২০২২ সালে বন্যায় ১৫ হাজার টাকা ঘর থেকে লোকসান দিতে হয়েছিল। সেই ভয় এবারও সত্য হতে চলেছে। আমাদের বিল কুজাইন ঘাট ও চন্দের বিলে এখনো যে পরিমাণ ধান আছে, তার চার ভাগের তিন ভাগই কাটা বাকি।’
একই এলাকার কৃষক জুয়েল রানা বলেন, ‘৩০ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছি। এখন সব জমির ধান মাঠেই আছে। এরই মধ্যে আড়াই বিঘা জমির ধান ডুবে গেছে। শ্রমিক পাচ্ছি না জমি থেকে ধান কেটে তুলতে। আমরা খুব অসহায় হয়ে গেছি। সরকার যায় আর আসে। কিন্তু আমাদের মতো কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা কেউ দেখে না। বিল কুজাইন ঘাটে একটি মাত্র সেতু
হলেই হাজার হাজার বিঘা জমির ধান কৃষক ঘরে তুলতে পারবে। কোনো ঝামেলা ছাড়া।’
রাধানগর ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা গানিউল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক। ইউনিয়নের বিভিন্ন বিলে এখনো ২০-২৫ হাজার বিঘা জমির ধান অবশিষ্ট রয়েছে। ঢলের পানি বাড়লে এই ফসল ঝুঁকির মুখে পড়বে। কৃষকরা নিজ উদ্যোগে ভেকু দিয়ে বাঁধ দিয়ে পানি ঠেকানোর চেষ্টা করছেন, আমরা তাঁদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছি।’