নিরাপদে মা ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করতে টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায়। রুপালি ইলিশের আশায় হাজার হাজার জেলে নেমেছেন নদীতে। জেলেদের জালে ইলিশের পাশাপাশি ধরা পড়ছে পাঙাশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এসব মাছ নিয়ে একের পর এক নৌকা ভিড়ছে নদী উপকূলীয় মাছঘাটগুলোতে। এতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে আড়তদার, মৎস্য ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে। তবে মাছের সরবরাহ শুরু হলেও কমেনি ইলিশের দাম। আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে বড় আকারের ইলিশ।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চাঁদপুর সদর উপজেলার হরিণা মাছঘাটে সরেজমিন জেলেদের মাছ আহরণ, ঘাটে আনা এবং কেনাবেচার এমন চিত্র দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকেই ইলিশ শিকারে পদ্মা-মেঘনায় নামতে শুরু করেন জেলেরা। ভোরের আলো ফুটতেই মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে থাকেন তাঁরা। হরিণা ফেরিঘাটসংলগ্ন মাছঘাটে একের পর এক জেলে নৌকা ভিড়ছে। প্লাস্টিকের ট্রেতে সাজিয়ে আনা হচ্ছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। ঘাটে মাছ নামানোর পরপরই শুরু হচ্ছে দরদাম ও হাঁকডাক। মুহূর্তেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে অনেক মাছ।
ঘাটটিতে ছোট-বড় প্রায় ২০টি ইলিশের আড়ত রয়েছে। এখানে মাছ সংরক্ষণ করে বিক্রির ব্যবস্থা তুলনামূলক কম। মূলত একশ্রেণির খুচরা ব্যবসায়ী শহরের বাজারে বিক্রির জন্য এবং অন্য ব্যবসায়ীরা চাঁদপুর বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য জেলেদের কাছ থেকে তাজা মাছ কিনে নিচ্ছেন।
ঘাটের পাশের গোবিন্দপুর গ্রামের জেলে লিটন তপাদার জানান, রাতে নদীতে নেমে ভোরে ঘাটে এসে ১২ হাজার টাকার ইলিশ বিক্রি করেছেন। এভাবে মাছ পাওয়া গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
আরেক জেলে ইসমাইল খান জানান, সাতজন মিলে মধ্যরাতে নদীতে নেমেছিলেন। ধরা পড়া ইলিশ বিক্রি করে পেয়েছেন ১৫ হাজার টাকা। কিছুক্ষণ পর আবারও মাছ ধরতে নদীতে নামবেন। তবে কয়েক দিন পর ইলিশের প্রাপ্যতা কমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
মাছঘাটের আড়তদার জাহাঙ্গীর সৈয়াল জানান, চাহিদা বেশি থাকায় ইলিশের দাম কমেনি। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। আর ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি হালি ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়।
তিনি আরও জানান, ইলিশের পাশাপাশি জেলেদের জালে পাঙাশও ধরা পড়ছে। বড় আকারের পাঙাশ প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ছোট আকারের পাঙাশ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ইলিশের সরবরাহ বাড়লে বাজারদরে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।
আড়তদার সেলিম ব্যাপারী বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে ঘাটে মাছ আসতে শুরু করেছে। আজ ও আগামীকাল মাছের সরবরাহ পর্যবেক্ষণ করলে ইলিশের আমদানি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। কারণ, আগের বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রথম দুই দিন মাছের সরবরাহ ভালো থাকলেও পরে তা কমে যেত।
আরেক আড়তদার ইব্রাহীম মিয়া বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে ঘাটে বড় আকারের ইলিশ বেশি আসছে। ছোট ইলিশের সংখ্যা তুলনামূলক কম। ইলিশের পরিমাণ প্রত্যাশার তুলনায় কম হলেও পাঙাশ পাওয়া যাওয়ায় জেলেদের লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন হরিণা মাছঘাটের প্রবীণ ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম সৈয়াল। তিনি বলেন, বছরের এই সময়ে নদীতে ইলিশে ভরপুর থাকার কথা। কিন্তু এবার সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময় একশ্রেণির জেলে মা ইলিশ শিকার করায় প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশাসন তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চাঁদপুর সদর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের দুটি অভিযান কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় জেলেরা এর সুফল পাচ্ছেন। ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশও পাওয়া যাচ্ছে। পাঙাশের উৎপাদন ও বংশবিস্তার বাড়াতে সরকারিভাবে কার্যকর প্রকল্প নেওয়া হলে এ মাছও ইলিশের মতো জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। তিনি বলেন, নদীর মৎস্যসম্পদ রক্ষায় জেলেদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।