আন্তর্জাতিক নারী
প্যারিসের গর্ব এবং বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় স্থাপত্য আইফেল টাওয়ার। একে স্থানীয়ভাবে ফরাসি ভাষায় বলা হয় লা ডানে ডি ফের। অর্থাৎ আয়রন লেডি বা বাংলায় যাকে বলা হয় লৌহমানবী। মূলত পেটা লোহা দিয়ে নির্মিত এই বিশালাকার কাঠামোর স্থায়িত্ব এবং শৈল্পিক দৃঢ়তার কারণে এই নাম। টাওয়ারটির সরু এবং এর দীর্ঘ গড়ন একে একটি নারীসুলভ অবয়ব দিয়েছে। প্যারিসের আইকনিক স্থাপত্য আইফেল টাওয়ার শুধু পর্যটক আকর্ষণ নয়; এটি বিজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনেরও একটি প্রতীক। ১৩৫ বছর ধরে এই টাওয়ারের প্রথম তলার বাইরের দেয়ালে খোদাই করা ছিল ৭২ জন ফরাসি বিজ্ঞানীর নাম।
তারপরও একটি অপূর্ণতা ছিল দীর্ঘদিনের। সেটি হলো, এই তালিকায় থাকা সবার নাম ছিল পুরুষের। এ বছর সেই অপূর্ণতা ঘুচতে যাচ্ছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আইফেল টাওয়ারে যুক্ত হতে যাচ্ছে ৭২ জন নারী বিজ্ঞানীর নাম।
প্যারিস শহর কর্তৃপক্ষ, আইফেল টাওয়ার অপারেটিং কোম্পানি এবং ফেমাস অ্যাট সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে এই ৭২ জন নারী বিজ্ঞানীর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকায় থাকছেন নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ ও রসায়নবিদ মারি কুরি এবং প্রখ্যাত গণিতবিদ সোফি জার্মেইন। ১৭১২ সালে জন্ম নেওয়া প্রসূতি বিশেষজ্ঞ অ্যাঞ্জেলিক ডু কুড্রে থেকে শুরু করে গত বছর প্রয়াত হওয়া পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ইভন চোকুয়েট-ব্রুহাটের নামও থাকছে তাতে। চিকিৎসা, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানের মতো প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে সফল নারীদের নাম এখানে ঠাঁই পেতে যাচ্ছে।
এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত অন্যতম অনুপ্রেরণার নাম মার্গারেট পেরি। অত্যন্ত সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই রসায়নবিদ মারি কুরির সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে তিনি ফ্র্যান্সিয়াম নামে একটি মৌল আবিষ্কার করেন। ১৯৬২ সালে ফরাসি একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রথম নারী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন।
১৮৮৯ সালে আইফেল টাওয়ার নির্মাণের সময় এর নকশাকার গুস্তাভ আইফেল নাম খোদাই করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯ শতক পর্যন্ত বিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রাখা ৭২ জন পুরুষ বিজ্ঞানীর নাম খোদাই করেছিলেন তিনি। আধুনিক রসায়নের জনক ল্যাভয়সিয়ে, অ্যাম্পিয়ার কিংবা কার্নোর মতো বিজ্ঞানীদের নাম সেখানে থাকলেও কোনো নারী বিজ্ঞানীর জায়গা হয়নি। তবে দীর্ঘ ১৩৫ বছর পর এই লৈঙ্গিক বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে থাকা পুরুষ বিজ্ঞানীদের নামের ঠিক ওপরেই নারী বিজ্ঞানীদের এই নতুন সারি স্থাপন করা হবে।
মূল তালিকার মতো একই ফন্ট বা টাইপোগ্রাফি এবং সোনালি রঙের অক্ষর ব্যবহার করা হবে। যাতে পুরোনো ও নতুনের মাঝে এক চমৎকার মেলবন্ধন তৈরি হয়। ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এই খোদাই কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি শুধু নাম খোদাই নয়, বরং এটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে নারীদের যথাযথ স্থান দেওয়ার শক্তিশালী এক প্রতীক। প্যারিসের মেয়র অ্যান হিদালগো এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘খুব শিগগির কিশোরীরা যখন আইফেল টাওয়ারের দিকে তাকাবে, তখন তারা চিকিৎসক, গণিতবিদ, রসায়নবিদ কিংবা জীববিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারবে। এটি আমাদের সবার জন্য উদ্যাপনের বিষয়।’ ফেমাস
অ্যাট সায়েন্সের সহসভাপতি ইসাবেল ভগলিন জানান, এমন পদক্ষেপ বিজ্ঞানের ইতিহাসে নারী বিজ্ঞানীদের ভূমিকা স্বীকার করে এবং তাঁদের সঠিক মর্যাদা দেয়। এটি অন্যান্য ক্ষেত্রেও অনন্য এক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
তালিকাটি চূড়ান্ত করার জন্য বর্তমানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসা একাডেমিতে জমা দেওয়া হয়েছে। সব ঠিক থাকলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আয়রন লেডি খ্যাত আইফেল টাওয়ারের গায়ে স্থায়ীভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এই ৭২ জন মহীয়সী নারীর নাম। এর মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানের জগতে নারী-পুরুষের সমতা অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছাবে।
সূত্র: প্যারিস রিকরেট, দ্য চোজেন ডেইলি