হোম > নারী

আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য

ডা. ফারজানা রহমান

মারিয়ার (ছদ্মনাম) হাতে হঠাৎ কাটা দাগ দেখতে পাচ্ছিল তার সহপাঠীরা। মারিয়া খুব সচেতনভাবে চেষ্টা করত এই দাগ অ্যাপ্রোনের আড়ালে ঢেকে রাখতে। সহপাঠীরা জিজ্ঞাসা করলে এড়িয়ে যেত সে। খুব কাছের বন্ধুদেরও নিজের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলেনি। একদিন সন্ধ্যার পর তার সহপাঠীরা জানতে পারল মারিয়ার মৃত্যুর খবর।

শুধু সহপাঠী নয়, খবরটি শিক্ষকদের জন্যও খুব আকস্মিক আর হৃদয়বিদারক ছিল। ধীরে ধীরে জানা গেল, মা-বাবার কলহের কারণেই দিন দিন মানসিক অবসাদে ভুগছিল মেয়েটি। তাই সপ্তম শ্রেণির কিশোরী মারিয়া নিজেকেই মা-বাবার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছিল চিরতরে।

তবে চন্দনার (ছদ্মনাম) ঘটনাটি ভিন্ন। উনিশ বছর বয়সে নিজের ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে পরিবারের মতেই আংটিবদল হয়েছিল তাঁর। এরপর বিয়ের জন্য অপেক্ষা। দেড় বছরের মাথায় কোনো এক বিষয়ে দুজনের মধ্যে কলহ হয়। রাগের মাথায় চন্দনার হবু স্বামী আত্মহত্যা করেন।

পরদিন সকালে চন্দনার ঘুম ভাঙে দুঃসংবাদে—তাঁর প্রিয় মানুষটি আর নেই। এরপর পোস্টমর্টেম, থানা, পুলিশ। বারবার পুলিশের জেরার মুখে পড়ে নিজের শোককে সরিয়ে রাখতে হয়েছে জবানবন্দির আড়ালে। সহ্য করতে না পেরে গলায় দড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেও সফল হননি চন্দনা। সাত দিন অচেতন থেকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এখন জীবনকে পথে ফেরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। ২১ বছরের সেই দুঃস্বপ্নের মতো সময়গুলো ২৮ বছর বয়সেও তাড়া করে বেড়ায় তাঁকে।

এমন অনেক ঘটনাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আমাদের আশপাশে। পৃথিবীতে প্রতি আট সেকেন্ডে একটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। অথচ আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু। আত্মহত্যার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো, বিশ্বব্যাপী, জাতীয় এবং আঞ্চলিকভাবে সংকটে থাকা ব্যক্তিদের আরও সহায়তা করার জন্য নেওয়া পদক্ষেপকে উৎসাহিত করা উচিত।

আর তাই ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থার সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশন একযোগে দিবসটি পালনে কাজ করছে।

কিছু পরিসংখ্যান
অনেক কিছুর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে যোগ হয়েছে সাইবার নিরাপত্তাহীনতা। আধুনিকায়ন, শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। লিঙ্গনির্বিশেষে ব্ল্যাকমেলের শিকার হলেও এর বড় অংশে আছে বিভিন্ন বয়সের নারীরা। সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিক্যাফ) একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

‘বাংলাদেশে সাইবার অপরাধপ্রবণতা- ২০২৩’ শিরোনামের এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ইউনিটে ৩০ এপ্রিল ২০২৩ পর্যন্ত অভিযোগ জমা পড়ে ৩৪ হাজার ৬০৫টি। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৫৯২।

লিঙ্গভিত্তিক তুলনামূলক পরিসংখ্যানে সাইবার অপরাধে ভুক্তভোগীদের মধ্যে নারীর হার ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এই বিশাল সংখ্যার নারীর অনেকের মধ্যে দেখা দিয়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। সাইবার অপরাধে ভুক্তভোগী নারীদের এই উচ্চ হার জানিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তির অপব্যবহার, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি করছে ব্যাপক মাত্রায়।

এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যার সংখ্যা ৬৯ জন নারী। যৌন হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহত্যার সংখ্যা ১০ জন, ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৩ জন এবং যৌতুকের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৫ জন নারী। 

আত্মহত্যার কারণ 
বেকারত্ব, হতাশা, বিচ্ছেদ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব—এগুলো আত্মহত্যার সামাজিক কারণ। এটি বেশি দেখা দেয় কৃষক, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে। পরিবারে আত্মহত্যা ও মানসিক রোগের ইতিহাস থাকলে এর ঝুঁকি বাড়ে।

জেনেটিক বা বংশগতির সঙ্গে এর সরাসরি সংযোগ রয়েছে। আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যু হয়েছে, এ রকম মানুষের মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নামের হরমোন বা নিউরোট্রান্সমিটারের স্বল্পতা দেখা যায়। সাধারণত এককভাবে আত্মহত্যা হলেও কখনো কখনো দলগতভাবে, ধর্মীয় রীতি পালনের অংশ হিসেবেও এটি করা হয়ে থাকে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। আমাদের দেশে কিশোর-কিশোরী ও বিবাহিত নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আত্মহত্যার প্রবণতার কারণগুলো হয় বিবাহবিচ্ছেদ বা দাম্পত্য কলহ, সম্পর্কের জটিলতা, পারিবারিক সহিংসতা, লেখাপড়ার খারাপ ফল, মা-বাবা কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে দূরত্ব, মনোমালিন্য, তৃতীয় লিঙ্গ ইত্যাদি। 

আত্মহত্যার ঝুঁকিপূর্ণ নির্দেশক 
আত্মহত্যার পারিবারিক ইতিহাস, পারিবারিক অশান্তি, সহিংসতা, অবহেলিত শৈশব-কৈশোর, 
মানসিক-শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, দারিদ্র্য, একাকিত্ব, পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও নিজের মানসিক রোগ, বিশেষ করে বিষণ্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, মাদকাসক্তি, ব্যক্তিত্বের সমস্যা। 

প্রতিরোধের উপায় 
আত্মহত্যা যারা করে, করতে চায় বা পরিকল্পনা করে, তারা কিন্তু তাদের এই ইচ্ছার কথা জানিয়ে থাকে বিভিন্নভাবে। এ বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। আত্মহত্যার প্রবণতা মেডিকেল ও সাইকিয়াট্রিক ইমার্জেন্সি।

রোগী যদি সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়, তাহলে তার সঠিক চিকিৎসা করাতে হবে। যেমন বিষপান, ফাঁসি, পানিতে ডুবে যাওয়া, ওপর থেকে লাফ দেওয়া—এগুলোর কারণ যা-ই হোক, রোগীকে উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি তাকে অবশ্যই সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিয়মিত ফলোআপে থাকতে হবে।

চিকিৎসা, ওষুধ সেবন, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপির মাধ্যমে সঠিক কারণ অনুসন্ধানই পারে একজন মানুষকে নতুন জীবন দিতে। তবে আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু ওই মানুষ, তার পরিবার ও চিকিৎসক সম্পৃক্ত হলেই হবে না, এর দায়িত্ব সরকার, রাষ্ট্র এবং এর সঙ্গে যুক্ত পুরো সিস্টেমকে নিতে হবে।

ডা. ফারজানা রহমান, সহযোগী অধ্যাপক , মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট 

শরিয়তি ফারায়েজ অনুযায়ী মেয়ের সন্তান নানার সম্পত্তির সরাসরি ওয়ারিশ হয় না

নিরাপত্তাহীন নারী ও শিশু, সংখ্যা বাড়ছে নির্যাতিতের

শেক্‌সপিয়ার বিশেষজ্ঞ ভয়ংকর এক নারী ইয়েং থিরিথ

ক্ষত আর স্বপ্ন নিয়ে নতুন ভোরের অপেক্ষায় নারীরা

বইকে বেঁচে থাকার শক্তি হিসেবে দেখাতে চান দিয়া

সৌন্দর্যশিল্পের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ আরডেন

বড়দিনের বিখ্যাত গানগুলোর নেপথ্যের নারীরা

উদ্যোক্তা মেলা: সংখ্যা কমলেও আশাবাদী নারী উদ্যোক্তারা

রোজের ফুটে ওঠার গল্প

আন্তর্জাতিক নারী: অন্ধকার আকাশ যাঁর ল্যাবরেটরি