কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির মুখে স্মার্টফোনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। গত দুই দশকে ডিজিটাল দুনিয়ায় মানুষের প্রবেশদ্বার হিসেবে যে ডিভাইসটি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে—সেই আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েডচালিত স্মার্টফোন ব্যবস্থাই আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ জানিয়েছে—ওপেনএআই, মেটা ও অ্যামাজনের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা নতুন এমন এআই-চালিত ডিভাইস নিয়ে কাজ করছে, যা স্মার্টফোনের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান এবং ডিজাইনার স্যার জনি আইভ ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁরা এমন একটি ডিভাইস নিয়ে কাজ করছেন যার ব্যবহার অভিজ্ঞতা বর্তমান স্মার্টফোনের মতো হবে না। অল্টম্যান স্মার্টফোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে নিউইয়র্কের ঝলমলে আলো ও শব্দে ভরা টাইমস স্কয়ারে হাঁটার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁদের এই মন্তব্যই ইঙ্গিত দেয়, স্মার্টফোনের বাইরে নতুন কিছু আসছে।
বর্তমানে স্মার্টফোন বাজার কার্যত একটি দ্বৈত আধিপত্যের অধীনে—অ্যাপলের আইফোন এবং গুগলের অ্যান্ড্রয়েড। এই দুই প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সহযোগিতাও বাড়ছে। চলতি মাসেই ঘোষণা এসেছে, অ্যাপল তাদের সিরি ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট উন্নত করতে গুগলের জেমিনি এআই মডেল ব্যবহার করবে। তবু এই সহযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বীদের থামাতে পারছে না।
ওপেনএআই জানিয়েছে, তারা চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে তাদের নিজস্ব ডিভাইস উন্মোচনের পথে রয়েছে। অন্যদিকে জাকারবার্গের মেটা কোম্পানি এআই-চালিত স্মার্ট গ্লাসে জোর দিচ্ছে এবং ভার্চুয়াল রিয়ালিটি হেডসেট থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিচ্ছে। অ্যামাজনও তাদের অ্যালেক্সা-প্লাস এআই সহকারীকে ইকো স্পিকার, স্মার্ট গ্লাস ও ইয়ারবাডে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে স্মার্টফোন বাজারের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের বিশ্লেষক ইয়াং ওয়াংয়ের মতে, চলতি বছর বৈশ্বিক স্মার্টফোন সরবরাহ প্রায় ৬ শতাংশ কমতে পারে এবং ২০২৭ সালের আগে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম। মেমোরি চিপের দাম বৃদ্ধি, সেমিকন্ডাক্টর ফাউন্ড্রি সংকট এবং এআই চিপ নির্মাতাদের অগ্রাধিকার—সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে নির্মাতাদের ওপর।
চ্যালেঞ্জারদের আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো অ্যাপ স্টোরভিত্তিক কমিশন ব্যবস্থার বাইরে যাওয়া। অ্যাপলের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দীর্ঘদিন ধরেই ডেভেলপারদের ক্ষোভের কারণ। ওপেনএআই ও মেটা চায় এমন ডিভাইস, যেখানে তারা সরাসরি ব্যবহারকারীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
তবে বাস্তবতা হলো, স্মার্টফোনের প্রভাব এখনো বিশাল। বিশ্বজুড়ে স্মার্ট গ্লাসের ব্যবহারকারী যেখানে দেড় কোটি, সেখানে শুধু গত বছরই অ্যাপল প্রায় ২৫ কোটি আইফোন বিক্রি করেছে। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, গোপনীয়তার প্রশ্ন এবং ব্যাটারি ও তাপ ব্যবস্থাপনার মতো সমস্যাও বিকল্প ডিভাইসের পথে বড় বাধা।
বিশ্লেষকদের মতে, নিকট ভবিষ্যতে স্মার্টফোন পুরোপুরি বিদায় নেবে না। বরং এআই যুগে ডিভাইসের ভূমিকা বদলাবে—স্মার্টফোন কম ব্যবহৃত হবে, কিন্তু পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না। যেমন স্মার্টফোন আসার পরও ব্যক্তিগত কম্পিউটার বিলুপ্ত হয়নি, তেমনি এআই ডিভাইসের উত্থানেও স্মার্টফোন টিকে থাকতে পারে, নতুন রূপে।