যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার (আইপিও) পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবেন।
রকেট তৈরির পাশাপাশি ‘স্টারলিংক’ নামের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে স্পেসএক্স। এ ছাড়া মাস্কের বিতর্কিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান ‘এক্সএআই’-এর মালিকানাও রয়েছে এই কোম্পানির অধীনে।
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এটিই হতে যাচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও। আগামী মাসেই ‘SPCX’ টিকারে (প্রতীক) এটির লেনদেন শুরু হতে পারে।
স্পেসএক্সে নিজের শেয়ারের সুবাদে বর্তমান বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক এবার ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ বা লাখো কোটি টাকার মালিক হওয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছেন।
স্পেসএক্স নিজেদের বাজারমূল্য নির্ধারণ করেছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি (১.২৫ ট্রিলিয়ন) ডলার। কোম্পানিতে মাস্কের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা থাকায় তাঁর অংশের মূল্যই হতে পারে ৬০ হাজার কোটি (৬০০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি।
বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান ইলন মাস্ক গত বছর প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ৫০ হাজার কোটি (৫০০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি সম্পদের মালিক হওয়ার রেকর্ড গড়েন।
স্পেসএক্সের এই শেয়ারবাজারভুক্তির মাধ্যমে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ কোটি (১ ট্রিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই আইপিও আবেদনের মাধ্যমে স্পেসএক্সের আর্থিক অবস্থার একটি চিত্র সামনে এসেছে।
দাপ্তরিকভাবে ‘স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজিস’ নামে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি গত বছর ১ হাজার ৮৬০ কোটি ডলার (১ হাজার ৩৮০ কোটি পাউন্ড) রাজস্ব আয় করলেও, বছর শেষে তাদের নিট লোকসান হয়েছে ৪৯০ কোটি ডলার।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটি ৪৭০ কোটি ডলারের শেয়ার বিক্রি করলেও, নিট লোকসান হয়েছে ৪৩০ কোটি ডলার।
এদিকে স্পেসএক্সের ব্যালেন্স শিট বা আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, রকেট ও অন্যান্য সরঞ্জামসহ কোম্পানিটির ১০ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সম্পদ রয়েছে। তবে এর বিপরীতে তাদের ঋণের পরিমাণও কম নয়—প্রায় ৬ হাজার ৫০ কোটি ডলার।
পাশাপাশি আইপিও আবেদনে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সম্ভাব্য ব্যয় বাবদ ৫০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ আলাদা করে রাখার কথা উল্লেখ করেছে স্পেসএক্স।
এসব আইনি জটিলতার কিছু তৈরি হয়েছে ‘এক্সএআই’-এর তৈরি চ্যাটবট ‘গ্রক’-এর বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক মামলার কারণে। যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, নারীদের ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের আপত্তিকর ডিপফেক (ভুয়া ছবি ও ভিডিও) তৈরিতে এই চ্যাটবট ব্যবহার করা হচ্ছে।
অবশ্য মাস্ক জানিয়েছেন, তিনি এক্সএআই বিলুপ্ত করে স্পেসএক্সের অধীনেই তাঁর এআই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করতে চান।
টুইটার কিনে নেওয়ার পর ২০২২ সালে মাস্ক যেটির নাম বদলে ‘এক্স’ রেখেছিলেন, সেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটিও এখন স্পেসএক্সের মালিকানাধীন।
আইপিও আবেদনে স্পেসএক্সের বিরুদ্ধে চলমান অন্য যেসব মামলার তালিকা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে পেটেন্ট বা স্বত্ব লঙ্ঘন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কনটেন্ট মডারেশন নীতিমালা না মানা, সংগীতের কপিরাইট লঙ্ঘন এবং তথ্য চুরির (ডাটা ব্রিচ) অভিযোগ।
গত বুধবার জমা দেওয়া আইপিও আবেদনে আরেকটি বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। সেটি হলো, প্রতিদ্বন্দ্বী এআই প্রতিষ্ঠান ও ‘ক্লদ’ (Claude)-এর নির্মাতা অ্যানথ্রোপিকের সঙ্গে স্পেসএক্সের সাম্প্রতিক চুক্তির আর্থিক শর্তাবলি।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত মাস্কের এক্সএআই-এর ডেটা সেন্টার ব্যবহারের জন্য বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার পরিশোধ করবে অ্যানথ্রোপিক। উল্লেখ্য, এক্সএআই সম্প্রতি স্পেসএক্স অধিগ্রহণ করেছে।
মাস্কের এআইভিত্তিক উদ্যোগগুলো একের পর এক বিতর্কে জড়ালেও, স্পেসএক্সের রকেট ব্যবসা এবং স্টারলিংক এই শিল্পে শীর্ষস্থানে রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে দুটি ব্যবসাই বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে এগিয়ে আছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী এআই প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এবং এর প্রধান স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে এক হাইপ্রোফাইল আইনি লড়াইয়ে মাস্কের হেরে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিন পরই আইপিওর এই আবেদনটি এল।
মাস্ক অভিযোগ করেছিলেন যে, লাখ লাখ ডলার অনুদান নেওয়ার পর চ্যাটজিপিটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটিকে অলাভজনক থেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করে অল্টম্যান চুক্তি ভঙ্গ করেছেন।
তবে জুরি বোর্ড সর্বসম্মতভাবে মামলাটি খারিজ করে দেয়। আদালত জানান, ২০২৪ সালে মামলাটি করতে মাস্ক অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছেন এবং আইনি দাবি তোলার সময়সীমা পার হয়ে গেছে।
বিচার চলাকালে মাস্ক জুরিদের বলেছিলেন, ওপেনএআইয়ের তুলনায় তাঁর এআই স্টার্টআপ ‘এক্সএআই’ একেবারেই ছোট। ওপেনএআই-ও খুব শিগগির সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে স্পেসএক্সের তৈরি মেগারকেট ‘স্টারশিপ’ চলতি সপ্তাহেই উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। তবে নিজেদের কারখানায় কর্মীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে কোম্পানিটি।
ডানপন্থী রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে মাস্ক নিজেও সমালোচিত। গত সপ্তাহে ট্রাম্পের চীন সফরেও তাঁর সঙ্গী ছিলেন ইলন মাস্ক।