ব্যবসার গোপন তথ্য চুরির অভিযোগ এনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এবং দুই সাবেক কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে টেক জায়ান্ট অ্যাপল। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটির জন্য নিজস্ব হার্ডওয়্যার তৈরির লক্ষ্যে অ্যাপলের ‘ট্রেড সিক্রেট’ হাতিয়ে নিয়েছে ওপেনএআই। এই ঘটনায় আইফোন নির্মাতা অ্যাপল ও এআই খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের মধ্যকার অংশীদারত্বে বড় ধরনের ফাটল ধরল।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত শুক্রবার ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আদালতে এই অভিযোগ করা হয়। মামলায় দাবি করা হয়েছে, এটি অ্যাপলের পণ্যের নকশা, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং সরবরাহব্যবস্থার কৌশলসহ বিভিন্ন গোপন তথ্য চুরির পেছনে একটি সুসমন্বিত প্রচেষ্টা ছিল।
মামলায় আসামি করা হয়েছে অ্যাপলের সাবেক জ্যেষ্ঠ সিস্টেমস ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার চ্যাং লিউ এবং আইফোন ও অ্যাপল ওয়াচের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রোডাক্ট ডিজাইন) ট্যাং ইউ ট্যানকে। এ ছাড়া ওপেনএআই ফাউন্ডেশন, ওপেনএআই গ্রুপ পিবিসি এবং আইও প্রোডাক্টসকেও আসামি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ওপেনএআইয়ের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কেউই তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অ্যাপলের অভিযোগ, চ্যাং লিউ কোম্পানি থেকে দেওয়া ল্যাপটপটি ফেরত দিতে ব্যর্থ হন এবং পরে সিস্টেমের একটি নিরাপত্তা ত্রুটির (অথেনটিকেশন বাগ) সুযোগ নিয়ে অ্যাপলের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে তিনি ‘অ্যাপলের হার্ডওয়্যার–সম্পর্কিত ডজনখানেক গোপন ফাইল’ ডাউনলোড করেন।
আইফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি আরও দাবি করেছে, ওপেনএআইয়ের হার্ডওয়্যার বিভাগের প্রধান ট্যাং ইউ ট্যান চাকরি ছাড়ার আগে অ্যাপলের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ শিল্প–সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ নিজের ই-মেইলে পাঠিয়ে রাখতেন। তিনি ‘সুপরিকল্পিতভাবে অ্যাপলের গোপন তথ্য ওপেনএআইয়ের স্বার্থে ব্যবহার করছিলেন’ বলে অ্যাপলের দাবি।
অ্যাপল আরও অভিযোগ করেছে, ট্যান ওপেনএআইয়ে চাকরির সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে যাওয়া অ্যাপলের কর্মীদের প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সঙ্গে নিয়ে যেতে উৎসাহিত করতেন, যাতে সেগুলো ‘শো অ্যান্ড টেল’ পর্বে দেখানো যায়।
মামলায় এমন একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ওপেনএআইয়ের চাকরিপ্রার্থী একজন নাকি বলেছিলেন, ‘অফিস থেকে এগুলো নিয়ে আসা যায়, তা তো আমি জানতামই না।’
অ্যাপল তাদের নথিতে জানিয়েছে, বর্তমানে অ্যাপলের চার শতাধিক সাবেক কর্মী ওপেনএআইতে কাজ করছেন। ফলে তাদের কারও কারও কাছে অ্যাপলের গোপন তথ্য থাকাটা ‘আশ্চর্যজনক’ কিছু নয়।
অভিযোগপত্রে আইফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি লিখেছে, ‘ওপেনএআই এখন এমন সব মানুষকে চাকরি দিয়েছে, যাদের একসময় অ্যাপলের ট্রেড সিক্রেটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ওপেনএআই তাদের হার্ডওয়্যার তৈরির কাজকে গতিশীল করতে সেই গোপন তথ্য ব্যবহারের অধিকার পেয়ে যাবে।’
ওপেনএআই এখন পর্যন্ত তারা কী ধরনের ডিভাইস তৈরি করছে, তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, প্রচলিত পণ্য ও ব্যবহারকারী–ইন্টারফেসের বাইরে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যোগাযোগের নতুন একটি উপায় খুঁজে বের করাই তাদের লক্ষ্য। অ্যামাজন ও গুগল এক দশক আগে ঘরে ব্যবহারের জন্য পর্দাবিহীন ভয়েস–নির্ভর স্মার্ট স্পিকার বাজারে আনার পর সর্বাধুনিক এআই প্রযুক্তির একটি বাস্তব রূপ দেওয়ার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ এটি।
মামলায় দাবি করা হয়েছে, এই প্রচেষ্টার আংশিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে অ্যাপলের কাছ থেকে চুরি করা জ্ঞানের ওপর।
অ্যাপল আরও অভিযোগ করেছে, ওপেনএআইয়ের কর্মীরা অ্যাপলের সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
অ্যাপল জানায়, একপর্যায়ে তাদের একজন সরবরাহকারী ওপেনএআইয়ের জন্য একটি গোপন মেটাল ফিনিশিং (ধাতব প্রক্রিয়াজাতকরণ) প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ওই সরবরাহকারীর ধারণা ছিল, এআই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির এই কৌশল ব্যবহারের পেছনে অ্যাপলের অনুমতি রয়েছে।
অভিযোগপত্রে অ্যাপল আরও দাবি করেছে, তাদের গোপন তথ্য ওপেনএআইয়ের কাছে চলে যাচ্ছে—এমন উদ্বেগ জানিয়ে তারা গত ফেব্রুয়ারিতে ওপেনএআইকে চিঠি দিয়েছিল এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু তারা কোনো উত্তর পায়নি।
সফটওয়্যারের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রাহকপর্যায়ের হার্ডওয়্যার ব্যবসায় পা রাখতে ওপেনএআই গত বছর ৬৫০ কোটি ডলারের একটি চুক্তির মাধ্যমে হার্ডওয়্যার স্টার্টআপ ‘আইও প্রোডাক্টস’ কিনে নেয়। এই স্টার্টআপটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অ্যাপলের সাবেক ডিজাইনার জনি আইভ। তবে এই মামলায় জনি আইভের নাম উল্লেখ করা হয়নি।