হামজা চৌধুরী আসার পরই বাংলাদেশ দলে প্রবাসী বাংলাদেশি ফুটবলারদের যোগ দেওয়ার জোয়ার এসেছে। ফাহামিদুল ইসলাম, অ্যাডাম আব্বাস, শুকি ইতফুসা, জিদান ইউসুফ, ফারহান আলী ওয়াহিদরা এসেছেন। মাত্র পাঁচ মাস দায়িত্বে থেকেই টমাস ডুলি ধরতে পেরেছেন কার, কোথায়, কতটা উন্নতি করতে হবে।
বাংলাদেশের জার্সিতে দেড় বছরে ১৩ ম্যাচ খেলে হামজা ৪ গোল করেছেন। অ্যাসিস্ট করেছেন এক গোলে। কখনো পানেনকা, কখনো বাইসাইকেল কিকে চোখধাঁধানো গোল করছেন তিনি। তা ছাড়া পুরো মাঠজুড়েই দেখা যায় বাংলাদেশের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের পদচারণা। পাঁচ মাস দায়িত্বে থেকেই হামজার সঙ্গে বাকিদের পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন ডুলি। মাঠে হামজার মুভমেন্টগুলো তাঁর খেলার সৃজনশীলতারই অংশ। নিজেদের পায়ে বল থাকলে দৌড়ে গিয়ে একটা জায়গায় পজিশন নিতে হয়, যেখানে পাসটা তাঁকে দেওয়া যায়। এই বিষয়গুলো দলের অনেকেই জানেন না। ডুলি বলেন, ‘এ সব বিষয় হামজা জানে, কারণ, সে উন্নত ফুটবলকাঠামোর মধ্যে বড় হয়েছে এবং খেলেছে।’
কিন্তু দলের অন্যান্য প্রবাসী ফুটবলাররা কি তা জানেন? এ বছরের মে মাসে কোচ হওয়ার পর তাঁর দলে খেলা অন্যান্য প্রবাসী ফুটবলারদের নিয়েও সম্যক একটা ধারণা পেয়েছেন ডুলি। অন্যান্য প্রবাসী ফুটবলারদের কারা কেমন? আজকের পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ কোচ বললেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে বড় চমক ছিল জিদান। তাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। মালয়েশিয়ার বিপজ্জনক ফরোয়ার্ডদের সামলাতে মাঝমাঠের কেন্দ্রীয় বা রক্ষণভাগের মাঝের জায়গায় কাকে খেলানো যায়, তা নিয়ে আমি স্টাফ সদস্যদের এবং দলে থাকা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সবাই বলেছিল, (শাকিল আহাদ) তপু সবচেয়ে অভিজ্ঞ। কিন্তু সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।’
আসিয়ান কাপে গত ২৫ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হেরে যায় বাংলাদেশ। তিনটি গোলই তপুর ভুলে হয়েছে। ডুলি এরপর তপুকে বসিয়ে জিদানকে খেলানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। বাংলাদেশ কোচ বলেন, ‘মালয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রতিটি গোলের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে সে (তপু) জড়িত ছিল। প্রতিপক্ষের চাপে সে অনেক ভুল করেছে। তখন বলেছিলাম, এবার জিদানকে খেলাতে হবে। তাকে দেখতে চাই। কারণ, এর চেয়ে বেশি ভুল করার সুযোগ তো দেওয়া যায় না। জিদান দারুণ খেলেছে। ভবিষ্যতের জন্য সে বড় সম্পদ।’
বয়সভিত্তিক ফুটবলে ইংল্যান্ডের চেলসি, ফুলহামের হয়ে খেলেছেন ফারহান। ক্লাব ক্যারিয়ারে সিনিয়র পর্যায়ে ফুলহামে খেলা এই ফুটবলার বোরহামউডের জার্সিতে ধারে খেলছেন। ফুলহামের একাডেমিতে বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কারও জিতেছেন তিনি। আসিয়ান কাপে ইন্দোনেশিয়র বিপক্ষে করা গোলটাই বাংলাদেশর জার্সিতে তাঁর একমাত্র গোল। তবে তাঁর পারফরম্যান্সে ডুলি তেমন একটা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। আজকের পত্রিকাকে বাংলাদেশ কোচ বলেন, ‘আমি জানি ফারহান একজন ভালো ফিনিশার। কিন্তু মালয়েশিয়ার বিপক্ষে তার কাছ থেকে কিছুই দেখিনি। সত্যি বলতে, আপনি যদি ম্যাচটি মনোযোগ দিয়ে দেখেন এবং ফুটবল সম্পর্কে সামান্য জ্ঞানও থাকে, তাহলে বুঝবেন, সে কিছুই করতে পারেনি। রক্ষণে সাহায্য করেনি, বল ধরে রাখতে পারেনি, নিজের কাছে আসা প্রায় প্রতিটি বল হারিয়েছে। মনে হয়েছে, আমরা ১০ জন নিয়ে খেলছি। শেষ ম্যাচের আগে অথবা সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচের পর ফারহানের সঙ্গে আমার দীর্ঘ কথা হয়েছিল। তাকে বলেছিলাম, হয়তো এই মুহূর্তে টুর্নামেন্টে খেলতে সে পুরোপুরি প্রস্তুত না। কিন্তু যদি খেলতে চায়, তাহলে কঠোর পরিশ্রম করে দলে থাকার যোগ্য প্রমাণ করতে হবে।’
ফারহানের আগে বাংলাদেশ দলে যোগ দেন শুকি ইতফুসা। আগে এসেই কি বাংলাদেশের কন্ডিশনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছেন শুকি—ডুলি এর উত্তরটা দিয়েছেন একটু কৌশলে। বাংলাদেশ কোচের কাছে ম্যাচ জেতাই মূল লক্ষ্য। ডুলি বলেন, ‘আমি ম্যাচ জিততে চাই। এই মুহূর্তে দলের জন্য কে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারবে, আমাকে সেটাই দেখতে হবে। শুকি মাঠে নামার পর যদি দ্বিতীয়ার্ধে আমাদের খেলা প্রথমার্ধের চেয়ে অনেক ভালো হয়, তাহলে কেন হলো? কারণ, তখন আমরা কার্যত ১১ জন নিয়ে খেলছিলাম। ফাহামিদুল ও ফারহানকে তুলে দুই খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়েছিলাম। তারা ভালো খেলেছে। দলও ভালো খেলেছে।’
ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলে বাংলাদেশ হারলেও দলের একটি গোলে শুকি অবদান রেখেছেন। শুকির ক্রস থেকে হেডে সেই ম্যাচে গোল করেন শাহরিয়ার ইমন। তবে শুকিরও অনেক কিছু শেখার আছে বলে মনে করেন ডুলি। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ কোচ হামজার নাম উল্লেখ করেছেন, ‘বদলি হিসেবে নামার পর সে তুলনামূলক ভালো খেলেছে। তবে তারও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে। যেমন তার ক্রসগুলো ঠিকমতো হচ্ছে না। ক্রসের মান আরও ভালো হতে হবে। আরেকটি সমস্যা হলো, সে যথেষ্ট লড়াকু নয়। হামজাকে দেখুন। সে যখন একের পর এক বিপক্ষে লড়াইয়ে যায়, তখন প্রতিপক্ষকে কার্যত শেষ করে দেয়। আমাদের এভাবেই খেলতে হবে। আপনি যদি নরমভাবে খেলেন, চোট পাওয়ার ভয়ে লড়াইয়ে না যান, তাহলে ম্যাচ জিততে পারবেন না। শক্ত হতে হবে। প্রতিটি দ্বৈরথে লড়তে হবে। আমি শুকিকে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবেও খেলানোর কথা ভাবছি।’