১১ জুন শুরু ফুটবল বিশ্বকাপ । যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮ দল। ‘বিশ্বকাপের দল’ শীর্ষক এই ধারাবাহিকে কোন দল কেমন , সেটি তুলে ধরার প্রয়াস । আজকের পর্বে জাপান
সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের ফুটবলে এখন নতুন ভোরের প্রতীক্ষা। গত বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারানো ব্লু সামুরাইরা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা এখন আর শুধু লড়াকু দল নয়, বরং জায়ান্ট কিলার। স্বাগতিকদের বাইরে প্রথম দেশ হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে বিশ্বমঞ্চে বড় কিছুর বার্তা দিচ্ছে দলটি।
জাপানি ফুটবলের এই বদলে যাওয়ার কারিগর কোচ হাজিমে মোরিয়াসু। তাঁর দর্শন আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা খেলার ধরনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। জাপান এখন আর শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে না, বরং তাদের প্রেসিং এবং দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ শক্তিশালী রক্ষণভাগের জন্য আতঙ্কের কারণ। রিতসু দোয়ান, তাকেফুসা কুবো এবং কাওরু মিতোমাদের মতো তরুণেরা এখন ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, যা তাঁদের আত্মবিশ্বাসকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এবারের বিশ্বকাপে এফ গ্রুপে নেদারল্যান্ডস, তিউনিসিয়া এবং সুইডেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে জাপানের লড়তে হবে। তবে বড় দুশ্চিন্তার নাম অধিনায়ক ওয়াতারু এনদো ও মিতোমার চোট। দুজনের ফিট হওয়ার অপেক্ষায় ক্ষণ গোনা ছাড়া আর উপায় নেই।
যদিও মার্চ মাসের আন্তর্জাতিক বিরতিতে এনদোকে ছাড়াই স্কটল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের মতো দলকে তাদের নিজেদের মাটিতে হারিয়ে জাপান প্রমাণ করেছে, বেঞ্চের গভীরতা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কোচ মোরিয়াসু গত এক বছরে ৬৫ খেলোয়াড়কে পরখ করে দেখেছেন, যা ফুটবলে বিরল।
পরিসংখ্যান বলছে, জাপান বাছাইপর্বে ৩০ গোল করেছে এবং হজম করেছে মাত্র ৩টি। এই বিধ্বংসী ফর্মই বলে দিচ্ছে তারা কতটা ক্ষুধার্ত। ১৯৯৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলার পর থেকে তারা আর কখনো আসর থেকে বাদ পড়েনি। তবে প্রতিবারই শেষ ষোলোর গেরোয় আটকে যেতে হয়েছে তাদের। ২০০২, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২—চারবার নকআউট পর্বে পৌঁছালেও কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্নটি এখনো অধরাই রয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের সেই নাটকীয় হার কিংবা ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে স্বপ্নভঙ্গ জাপানি ভক্তদের মনে এখনো ক্ষত হয়ে আছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের লক্ষ্যটা তাই জাপানের কাছে খুব পরিষ্কার—প্রথমবারের মতো শেষ আটের বাধা টপকানো। জাপানি ফুটবলে যে শৃঙ্খলার ছাপ দেখা যায়, তা শুধু মাঠের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। দর্শকদের গ্যালারি পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের ড্রেসিংরুম পরিপাটি রাখা—জাপানিরা বারবার প্রমাণ করেছে ফুটবল শুধু খেলা নয়, বরং তাদের সংস্কৃতির অংশ। এই ঐক্য আর শৃঙ্খলাই ব্লু সামুরাইদের মূল চালিকাশক্তি। কন্ডিশনিং এবং দীর্ঘ ভ্রমণের ধকল সামলে উত্তর আমেরিকার বৈরী আবহাওয়ায় জাপান যদি তাদের সহজাত গতি বজায় রাখতে পারে, তবে ডালাস ও মেক্সিকো সিটির মাঠগুলোতে নতুন কোনো রূপকথা লেখা হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার।
২০১৮ সাল থেকে জাপানের প্রধান কোচের দায়িত্বে আছেন হাজিমে মোরিয়াসু। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি সানফ্রেচ হিরোশিমা ও জাতীয় দলের মাঝমাঠের খেলোয়াড় ছিলেন। কোচ হিসেবেও তিনি সফল; তাঁর অধীনেই হিরোশিমা তিনটি জে-লিগ শিরোপা জেতে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে জাপানকে শেষ ষোলোয় নিয়ে গিয়ে তিনি ইতিহাস গড়েন। খেলোয়াড়দের পরিচালনা এবং তরুণদের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি দারুণ পারদর্শী। তাঁর হাত ধরেই জাপানি ফুটবলে নতুন লড়াকু প্রজন্ম তৈরি হয়েছে।
খুব অল্প বয়সেই বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন তাকেফুসো কুবো। বার্সেলোনার বিখ্যাত ‘লা মাসিয়া’ একাডেমিতে তাঁর ফুটবলের হাতেখড়ি। জাপানে ফেরার পর দুর্দান্ত কিছু পারফরম্যান্স তাঁকে রিয়াল মাদ্রিদের নজরে আনে। লা লিগার বিভিন্ন ক্লাবে ধারে খেলার পর কুবো শেষ পর্যন্ত রিয়াল সোসিয়েদাদে থিতু হন। মাঠে দ্রুতগতি, ক্ষিপ্রতা এবং ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে পড়ার সহজাত দক্ষতার কারণে কুবো বর্তমানে লা লিগার অন্যতম সেরা পারফর্মার। বিশ্বকাপে বড় সাফল্যের লক্ষ্যে থাকা জাপানের অন্যতম ভরসা তিনি।
বিশ্বকাপে জাপানের ইতিহাস
র্যাঙ্কিং: ১৮
অঞ্চল: এশিয়া
অংশগ্রহণ: ৮
ডাকনাম: ব্লু সামুরাই
সর্বোচ্চ সাফল্য: শেষ ষোলো (২০০২, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২)