এমানুয়েল গুতিয়েরেস। ডাকনাম মানু। তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা কানসাসে, আর্জেন্টিনার ট্রেনিং সেন্টারে। পরে আবার দেখা কানসাস স্টেডিয়ামের মিডিয়া সেন্টারে। ভেনেজুয়েলার তরুণ স্বাধীন সাংবাদিক (ফ্রিল্যান্সার) মানু গুতিয়েরেস এবারের বিশ্বকাপে এমন সব সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, যা অনেক প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকের কাছেও ঈর্ষণীয়।
কার কার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তালিকাটা দেখুন—দুই দফায় লিওনেল মেসি, আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি, ইংলিশ তারকা জুড বেলিংহাম, আর্জেন্টাইন তারকা ক্রিস্তিয়ান রোমেরো...। এসব সাক্ষাৎকার তিনি নিয়েছেন বিশ্বকাপে সাংবাদিকদের কাছে বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘মিক্সড জোনে’—স্টেডিয়ামের সেই সরু করিডরে, যেখানে ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের ভিড় ঠেলে খেলোয়াড়দের কয়েকটি কথা শোনার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। আর সেই জন-অরণ্যের মাঝেই হুইলচেয়ারে বসে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন মানু গুতিয়েরেস।
শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক অসাধারণ গোল দিয়ে চলেছেন মানু। ভেনেজুয়েলার ছোট্ট শহর পুন্তো ফিহোতে তাঁর জন্ম। জন্মের সময় জটিলতার কারণে তিনি সেরিব্রাল হাইপোক্সিয়ায় আক্রান্ত হন। মানু হাঁটতে পারেন না। চলতে হয় হুইলচেয়ারে। শরীর অচল হয়ে গেলেও মানুর চিন্তাশক্তি, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতায় প্রভাব পড়েনি, অদম্য মনোবলে তিনি এগিয়ে চলেছেন। ফুটবল বিশ্বকাপের মতো মহা ক্রীড়াযজ্ঞে দারুণ সব কাজ উপহার দিয়ে চলেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানু ভাইরাল হয়েছেন মূলত মেসির সাক্ষাৎকার নিয়ে। প্রথমবার তিনি আর্জেন্টিনা জাদুকরের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বিশ্বকাপের আগে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে। আবার তিনি আলোচনায় কদিন আগে আটলান্টায় মিসরের বিপক্ষে মিক্সড জোনে মেসির সাক্ষাৎকার নিয়ে।
আর্জেন্টিনার আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের পর যখন মিক্সড জোনে মেসির সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পাননি, তখনো মানু হাল ছাড়েননি। বাইরে অপেক্ষমাণ সমর্থকদের ভিড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। আর সেখানেই এসেছে জীবনের বহুল কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। ঘটনাটি স্মরণ করে মানু বলেন, ‘‘তখন বলেছিলাম, ‘আমি একজন সাংবাদিক, লিও। শুধু একটি প্রশ্ন।’ নিজের পরিচয় দিতে হয়েছিল; কারণ, মিক্সড জোনে তিনি আমাকে খেয়াল করেননি। আমি নিচুতে ছিলাম বলে তাঁর চোখে পড়িনি। সমর্থকদের ভিড়ে চলে গিয়েছিলাম। ধাক্কাধাক্কি, ঠেলাঠেলি—কিছুই আমাকে থামাতে পারেনি। আমার মনে হচ্ছিল, একবার যদি তিনি আমাকে দেখেন, তবে নিশ্চয় কথা বলবেন। আর ঠিক সেটাই হয়েছিল।”
মানুর প্রথম প্রশ্ন ছিল—বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড থেকে মাত্র ৪ গোল দূরে থাকা নিয়ে মেসির অনুভূতি কী? মেসির উত্তর ছিল স্বভাবসুলভ বিনয়ী, ‘সত্যি বলতে, ব্যক্তিগত রেকর্ড নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি। সব সময় দলের সাফল্যকেই অগ্রাধিকার দিই।’ মিসরের বিপক্ষে ম্যাচের পর আবারও দারুণ এক দৃশ্য। শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে মেসি নিজেই মিক্সড জোনের ভিড়ের মধ্যে হেঁটে গিয়ে মানুর সামনে দাঁড়ালেন এবং দ্বিতীয়বারের মতো তাঁর সঙ্গে কথা বললেন।
মেসির সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা নিয়ে আজকের পত্রিকাকে মানু বলেন, ‘তাঁকে তাঁর রেকর্ড নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলেছিলাম, আপনি বলেন, রেকর্ডে আপনার কোনো নজর নেই। কিন্তু একের পর এক রেকর্ড ভেঙেই চলেছেন। মেসি লাজুক হেসে বলেছেন, সত্যি, রেকর্ড নিয়ে ভাবি না। আমার কাছে দলের সাফল্যই আসল কথা। মেসি আমার কাছে নায়ক। তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়া আমার কাছে বড় স্বপ্নপূরণের মতো।’
মেসিকে শুধু একজন ফুটবল জাদুকরই মনে হয় না, মানুষ হিসেবে কতটা বড় মাপের, সেটিও তুলে ধরেন মানু, ‘মেসি শুধু অবিশ্বাস্য ফুটবলারই নন, তিনি অনেক বড় মনের মানুষ। কতটা বিনয়ী, সেটি চোখের সামনে দেখছি।’
মানু যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বাস করেন, থাকেন আলাবামায়। ২০২১ থেকে যুক্ত সাংবাদিকতার সঙ্গে। তবে ১৫ বছর বয়সেই ছিলেন রেডিও প্রযোজক। ২০২৪ কোপা আমেরিকা থেকে ফুটবলের বড় টুর্নামেন্ট কাভার করেন। রিপোর্টিং মানেই দিনরাত দৌড়ঝাঁপের হ্যাপা। আর স্পোর্টস রিপোর্টিং মানে জনাকীর্ণ স্টেডিয়াম বা ভেন্যুতে দৌড়াদৌড়ি। কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ উতরে যাচ্ছেন মানু? বললেন, ‘শারীরিকভাবে অনেক কষ্টের। পেছন আর হাঁটুব্যথা হয়ে যায়। তবে এটা আমার কাছে অনেক মূল্যবান। শারীরিক সীমাবদ্ধতায় ফুটবল খেলতে না পারার কারণেই আমি সাংবাদিকতার পথে এসেছি; আর বুঝতে পেরেছিলাম, সাংবাদিকতা আমাকে সেই স্বপ্নের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে।’
মানু বাংলাদেশকে ভালোভাবেই চেনেন। আর্জেন্টিনা নিয়ে বাংলাদেশের উন্মাদনার খবর তাঁর খুব ভালো জানা, ‘বাংলাদেশকে আমি খুব ভালোভাবেই চিনি। অনেক ভিডিও দেখি। আর্জেন্টিনা ও মেসিকে নিয়ে বাংলাদেশের আবেগ মুগ্ধ করার মতো।’
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা মানুর স্বপ্ন পূরণ করেছেন মেসি। আর এই গল্প যেন অনুপ্রাণিত করছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা হাজারো মানুকে।