উত্তর আফ্রিকার সাহারার তপ্ত বালু আর ভূমধ্যসাগরের নোনা বাতাসের মিশেলে যে ফুটবল উন্মাদনা জন্ম নেয়, তার নাম আলজেরিয়া। দীর্ঘ ১২ বছরের এক শূন্যতা কাটিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে ফিরে আসা এই দল শুধু একটি ফুটবল দল নয়, বরং আত্মমর্যাদা আর প্রতিরোধের এক প্রতীক। আলজেরিয়ার ফুটবল ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায়, এটি শুধু মাঠের জয়-পরাজয়ের গল্প নয়, বরং অবিচারের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর এক মহাকাব্য। বিশেষ করে ১৯৮২ বিশ্বকাপে সেই ‘গিজন কলঙ্ক’ আজও আলজেরীয় ফুটবলে জ্বলন্ত ক্ষত হয়ে আছে। যা তাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকতে হলে শুধু খেলায় নয়, লড়তে হয় নিয়তির বিরুদ্ধেও।
পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেওয়া আলজেরিয়া যখন নকআউট পর্বের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই জার্মানি ও অস্ট্রিয়া মেতে ওঠে এক অঘোষিত ‘আঁতাতের’ খেলায়। ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটে জার্মানি গোল পাওয়ার পর বাকি সময় দুই দল স্রেফ উদ্দেশ্যহীনভাবে বল পাস করে পার করে দেয়, যাতে দুই দলই পরের রাউন্ডে যেতে পারে এবং আলজেরিয়া বাদ পড়ে। গ্যালারি থেকে দর্শকদের দুয়োধ্বনির তোয়াক্কা না করে মঞ্চস্থ হওয়া সেই প্রহসন আলজেরিয়াকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দিলেও ফুটবল বিশ্বকে দিয়েছিল এক বড় শিক্ষা—যার ফলে ফিফা গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে আয়োজনের নিয়ম করতে বাধ্য হয়। গিজনের সেই বেদনাদায়ক স্মৃতি থেকে প্রতিটি ধাপে আলজেরিয়া বিশ্বকে শিখিয়েছে কীভাবে ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠতে হয়।
বর্তমান কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচ যখন দায়িত্ব নেন, তখন দলটির অবস্থা ছিল বেশ টালমাটাল। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট হারানোর বেদনা আর বারবার হোঁচট খাওয়ার গ্লানি তাদের তাড়া করে ফিরছিল। কিন্তু পেতকোভিচ তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে ভর করে আলজেরিয়ান ফুটবলের পুরোনো সেই তেজ ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেন।
বিশেষ করে মোহামেদ আমুরার মতো তরুণ প্রতিভারা যখন মাঠের ঘাস ছিঁড়ে গোলের নেশায় দৌড়ান, তখন মনে হয় আলজেরিয়া তাদের সেই সোনালি দিনের উত্তরাধিকার খুঁজে পেয়েছে। যদিও ৩৫ বছর বয়সী অভিজ্ঞ রিয়াদ মাহরেজের ওপর দলের নির্ভরশীলতা এখনো দৃশ্যমান, তবে আমুরার ১০ গোল করার রেকর্ড জানান দিচ্ছে যে নতুনেরা স্বপ্ন দেখাতে প্রস্তুত।
আলজেরিয়ার এবারের বিশ্বকাপ যাত্রা মোটেও সহজ হবে না। তাদের গ্রুপে রয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে আলজেরিয়ানরা কোনোদিনও শক্তিতে নয়, বরং বিশ্বাসী ছিল সাহসে। ২০১৪ সালে জার্মানিকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত ঘামিয়ে ছাড়ার সেই লড়াই আজও ফুটবলপ্রেমীদের চোখে লেগে আছে। সেই আসরে আলজেরিয়া স্রেফ একটি দল ছিল না, ছিল ‘ডার্লিং অব দ্য টুর্নামেন্ট’। গিজনে যে স্বপ্ন চুরি হয়েছিল, পোর্টো আলেগ্রেতে তা পূর্ণতা পেয়েছিল এক অনন্য গৌরবে। আর্জেন্টিনাকে টপকে গ্রুপের শীর্ষে যাওয়া হয়তো অলীক মনে হতে পারে, কিন্তু জর্ডান বা অস্ট্রিয়ার মতো দলগুলোকে পেছনে ফেলে নকআউট পর্বে যাওয়ার সামর্থ্য ডেজার্ট ফক্সদের আছে। আলজেরিয়ার জন্য ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের এক লড়াই, যেখানে হার মানার কোনো শব্দ নেই।
কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচ
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলজেরিয়ার দায়িত্ব নেওয়া পেতকোভিচের প্রথম লক্ষ্যই ছিল দলকে একসুতায় গাঁথা। এর আগে তিনি সুইজারল্যান্ডে কাটিয়েছেন সাত বছর। তাঁর অধীনে সুইসরা ২০১৮-১৯ উয়েফা নেশনস লিগের চূড়ান্ত পর্বে এবং ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে পৌঁছেছিল। ২০২০ ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে নিয়ে যাওয়ার পর অবশ্য বেশি দিন আর কাজ করেননি। তাঁর অধীনে ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিন ও আক্রমণাত্মক ফুটবলের মিশেলে আলজেরিয়া দাপুটেভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছে।
তারকা রিয়াদ মাহরেজ
৩৫ বছর বয়সেও আলজেরিয়ার ফুটবল মানচিত্রে রিয়াদ মাহরেজ এক অপরিহার্য নাম। বাঁ পায়ের জাদুতে আজও প্রতিপক্ষ রক্ষণকে তটস্থ রাখেন তিনি। জাতীয় দলের পালাবদল প্রক্রিয়ার মধ্যেও আক্রমণভাগে দলের মূল ভরসা মাহরেজই। যদিও মোহামেদ আমুরার মতো তরুণেরা উঠে আসছেন, তবু চাপের মুখে মাহরেজের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দলের প্রধান শক্তি। বিশ্বকাপ রাঙাতে মাহরেজের জাদুকরি পারফরম্যান্সের দিকেই তাকিয়ে পুরো আলজেরিয়া।
আলজেরিয়ার ইতিহাস
র্যাঙ্কিং: ২৮
অঞ্চল: আফ্রিকা
ডাকনাম: ডেজার্ট ফক্স
অংশগ্রহণ: ৫
সর্বোচ্চ সাফল্য: শেষ ষোলো (২০১৪)