কানসাস সিটির রিভারফ্রন্ট এলাকায় আর্জেন্টিনা দলের বেস ক্যাম্পের সামনে পরশু রাতে কিছু ভক্ত-সমর্থক যথারীতি ড্রাম বাজাচ্ছিলেন, উল্লাস করে যাচ্ছিলেন। আটলান্টায় মিসরের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে কানসাসে বেস ক্যাম্পে ফিরেছে আর্জেন্টিনা। রাত ১০টায় নিরাপত্তাকর্মীরা ভক্ত-সমর্থকদের ড্রাম বাজানো ও চিৎকার বন্ধ করতে বললেন। মেসিরা ঘুমাবেন, যেন আর শব্দ না হয়।
মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোয় অসাধারণ জয়ের পর রাতে মেসিদের দারুণ ঘুম হওয়ার কথা। কিন্তু মিসরের মোস্তফা জিকোদের? নিশ্চিত, ঘুমেও তাঁদের তাড়িয়ে ফিরবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটা, মনের ভেতর জ্বলতে থাকবে আগুন। নিশ্চিত বারবার তাঁরা শাপশাপান্ত করবেন রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েকে। যাঁকে ‘জালিম’ বলেছেন মিসরের ফরোয়ার্ড জিকো। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হারের পর রেফারিং ও ভিএআরের দুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছে মিসর। দলটির কোচ হোসাম হাসানের দাবি, ৬২ মিনিটে মোস্তফা জিকোর করা গোলটি অন্যায্যভাবে বাতিল করা হয়েছে, আবার আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে ফাউল হলেও সেটি আমলে নেওয়া হয়নি। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটি ঘটনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। প্রথমটিতে একজন ডিফেন্ডার স্পষ্টভাবে প্রতিপক্ষের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন। কিন্তু সালাহর ঘটনায় দুজনের বুটের মধ্যে স্বাভাবিক সংস্পর্শ হয়েছিল, যেটা ছিল দুই খেলোয়াড়ের গতির ফল। দুটি ঘটনা এক না হলেও ম্যাচের অফিশিয়ালদের রীতিমতো শূলে চড়ানো হচ্ছে!
আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের রেফারিং কাঠগড়ায় ওঠার পেছনে অনেক কারণ আছে। শুধু এ ম্যাচ নয়, এবার বিশ্বকাপে রেফারিং বিতর্ক এমন পর্যায়ে গেছে, অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম! বসনিয়ার ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান লাল কার্ড দেখলেও ফিফা এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে দেয়। ফিফার এই সিদ্ধান্তের পেছনে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে বালোগানের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান ট্রাম্প। এরপরই ফিফার ব্যতিক্রমী রায়। এই বিতর্কিত ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, ফিফার নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার সক্ষমতা নিয়ে। তুমুল আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ফিফা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়। এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘ফিফা সীমা অতিক্রম করেছে’ বলে জানিয়েছিল উয়েফা।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ফিফার বিশেষ অনুমতিতে ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানকে নিয়ে খেলতে নেমেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি, বাজেভাবে হেরে বিদায় নিয়েছে তারা।
রেফারিং নিয়ে ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ টমাস টুখেল তুমুল সমালোচনা করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, ‘অসংগতিপূর্ণ’, ‘প্রত্যাশিত মানের নয়’ এমন রেফারিংয়ের কারণে বিশ্বকাপে টিকে থাকা যেকোনো দলই হঠাৎ করে বিদায় নিতে পারে। শেষ ষোলোর ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ৩-২ গোলের জয়ের পরও ম্যাচ পরিচালনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন টুখেল। এই ম্যাচে ইংল্যান্ডের জ্যারেল কোয়ানসা লাল কার্ড দেখেন।
বিশ্বকাপের শুরুর দিকে আলজেরিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসিকে কার্ড না দেখানো নিয়েই তুমুল সমালোচনা হয়েছিল। প্রায় প্রতি ম্যাচেই রেফারিরা উঠছেন কাঠগড়ায়। এর মধ্যে আরেক খবর, বোস্টনে ফ্রান্স-মরক্কো কোয়ার্টার-ফাইনালে সম্পূর্ণ আর্জেন্টাইন রেফারি প্যানেল নিয়োগ দিয়েছে ফিফা। ৪৪ বছর বয়সী ফাকুন্দো তেয়ো বোস্টন স্টেডিয়ামে ম্যাচ পরিচালনা করবেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো ম্যাচে একই দেশের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত পূর্ণাঙ্গ ম্যাচ-অফিশিয়াল প্যানেল দায়িত্ব পালন করবে।
ফিফার এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হারের পর থেকে ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র। তবে ফরাসি শিবির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না; তারা তেয়োর অভিজ্ঞতার ওপরই আস্থা রাখছে। খেলোয়াড়েরা শান্ত থাকলেও সমর্থকেরা অবশ্য সরব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য সমর্থক ফিফার এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিশ্বকাপে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক যুগে যুগে ছিল। ডিয়েগো ম্যারাডোনা যেমন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্ষমা করতে পারেননি মেক্সিকান রেফারি এডগার্ডো কোডেসালকে। ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিতর্কিত জার্মানিকে বিতর্কিত পেনাল্টি দিয়েছিলেন কোডেসাল। আবার ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের জন্য ইংলিশরা ক্ষমা করতে পারেন না তিউনিসিয়ান রেফারি আলি বিন নাসিরকে।
তবে এবার রেফারিং নিয়ে তর্ক-বিতর্ক একটু বেশিই হওয়ার কারণ হতে পারে, ভিএআরের পক্ষে-বিপক্ষে যাওয়া সিদ্ধান্ত।