একই ছাদের নিচে বেড়ে ওঠা, শৈশবে একই মাঠে ফুটবলের প্রথম পাঠ নেওয়া। অথচ বিশ্বকাপের আঙিনায় দাঁড়িয়ে যখন দুই ভাই দুই ভিন্ন দেশের জাতীয় সংগীতে গলা মেলাবেন, তখন দৃশ্যটা কেমন হবে? এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল মাঠে কেবল ট্রফির লড়াই নয়, যেন বদলে যাওয়া পৃথিবীর এক জীবন্ত মানচিত্রও। বিশ্বজুড়ে মানুষের নিরন্তর অভিবাসনের গল্প কীভাবে ফুটবলকে আষ্টেপৃষ্ঠে বদলে দিচ্ছে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এবার হাতেনাতে মিলছে। রক্তের বন্ধন এক হলেও, জাতীয়তার ভিন্ন সমীকরণে চার জোড়া ভাই এবার খেলতে নামছেন ভিন্ন ভিন্ন দেশের জার্সিতে।
এই তালিকায় এখন সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চ ছড়াচ্ছেন ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া দুই ভাই দেজিরে দুয়ে এবং গ্যুয়েলা দুয়ে। ফরাসি ক্লাব পিএসজির তরুণ উইঙ্গার দেজিরে খেলছেন ফ্রান্সের জার্সিতে। তাঁর বড় ভাই গ্যুয়েলা বেছে নিয়েছেন বাবার দেশ আইভরি কোস্টকে। কিছুদিন আগেই এক প্রীতি ম্যাচে গ্যালারিতে বসে ছোট ভাই দেজিরে দেখলেন, বড় ভাই গ্যুয়েলার চমৎকার গোল। যে গোলে ফ্রান্সকে হারিয়ে দিল আইভরি কোস্ট। ম্যাচের আগে দুই ভাইয়ের খুনসুটি আর ম্যাচের পর একে অপরের সাফল্যে আনন্দিত হওয়ার গল্পটা ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
একই রকম গল্প স্পেনের বাস্ক অঞ্চলে জন্ম নেওয়া উইলিয়ামস ভাইদেরও। দুই বছর আগে স্পেনের ইউরো জয়ের অন্যতম নায়ক ২৩ বছর বয়সী নিকো উইলিয়ামস খেলছেন স্পেনের হয়েই। অথচ তাঁর বড় ভাই ইনিয়াকি উইলিয়ামস একসময় স্পেনের হয়ে প্রীতি ম্যাচ খেললেও পরে নিজের সিদ্ধান্ত বদলান। তিনি এখন মাঠ মাতাচ্ছেন মা-বাবার দেশ ঘানার হয়ে।
ঘানা দলে অবশ্য একা নন ইনিয়াকি, তাঁর সঙ্গে আছেন নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া ডিফেন্ডার ডেরিক লুকাশেন। শেষ মুহূর্তে চোটের বদলি হিসেবে ঘানা দলে ডাক পাওয়া লুকাশেন এই বিশ্বকাপে দূর থেকে দেখবেন তাঁর সৎভাই ব্রায়ান ব্রবির লড়াই। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে দুর্দান্ত এক মৌসুম কাটানো ২৪ বছর বয়সী স্ট্রাইকার ব্রবি খেলছেন নেদারল্যান্ডসের জার্সিতে। একই মায়ের এই দুই সন্তানের বাবারা ভিন্ন হলেও ফুটবল তাঁদের একই সমান্তরালে এনে দাঁড় করিয়েছে।
ইউরোপ ও আফ্রিকার এই মেলবন্ধনের বাইরে আরেকটি গল্প তৈরি হয়েছে স্কটল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াকে ঘিরে। স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিনে জন্ম নেওয়া দুই ভাই হ্যারি সুটার ও জন সুটারও হাঁটছেন ভিন্ন দুটি দেশের পথে। মা অস্ট্রেলিয়ান হওয়ায় বড় ভাই জন স্কটল্যান্ডের হয়ে খেললেও, ছোট ভাই হ্যারি সাত বছর ধরে সামলাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার রক্ষণভাগ।
আসলে গত কয়েক দশকে ইউরোপে মানুষের দেশান্তর আন্তর্জাতিক ফুটবলে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। আলজেরিয়া, মরক্কো, সেনেগাল কিংবা তিউনিসিয়ার মতো দলগুলোর স্কোয়াড লক্ষ করলে দেখা যায়, তাদের নিজ দেশে জন্ম নেওয়া ফুটবলারদের চেয়ে ইউরোপে বড় হওয়া প্রবাসীদের সংখ্যাই বেশি। বিশ্বকাপে ভাইয়ে-ভাইয়ে লড়াইয়ের ইতিহাস অবশ্য একদম নতুন নয়। ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির জেরোম বোয়াটেং এবং ঘানার কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেংয়ের সেই ঐতিহাসিক মুখোমুখি লড়াই বিশ্ব ফুটবল কখনোই ভুলবে না। তবে এবার একসঙ্গে চার জোড়া ভাইয়ের ভিন্ন ভিন্ন দেশের হয়ে খেলতে আসা বিশ্বায়নের এক অনন্য উদাহরণ। জার্সি যে রঙেরই হোক আর মানচিত্রের সীমানা যেখানেই শেষ হোক না কেন, দিন শেষে রক্তের টান আর ফুটবলের নান্দনিকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে এই বিশ্বকাপে।