বাতিগুলো যখন একে একে নিভে গেল, চারপাশটা যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল এক অলৌকিক ঘোরের মধ্যে। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আসতেকার আকাশে তখন ভাসছিল বিদায়ের সুর। গ্যালারির ৮০ হাজার মানুষ মোবাইল ফোনের আলো জ্বেলে এক সুরে গাইছিলেন কোনো এক মায়াবী গান।
মাঠের এক কোণে আলো-আঁধারির মাঝে গা গরম করছিলেন বেঞ্চের ফুটবলাররা। শুধু একজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন স্থির হয়ে। কপালে সেই চেনা ব্যান্ড, মাথায় কোঁকড়ানো চুল। নাম তাঁর গিয়োর্মো ওচোয়া। বিশ্বকাপ এলেই যাকে মনে পড়ে খুব ভালোভাবে।
চেনা আঙিনায় এমন ভালোবাসা ওচোয়া মনেপ্রাণে শুষে নিচ্ছিলেন। তিনি জানতেন, এই সবুজ জার্সিতে তাঁর গল্প শেষ হয়ে এসেছে। পরের সপ্তাহেই পা দেবেন ৪১ বছরে, এটিই তাঁর ষষ্ঠ এবং শেষ বিশ্বকাপ, শেষ ম্যাচ। বিদায়ের এই ক্ষণে ওচোয়ার সেই চাউনিতে ছিল এক অদ্ভুত তৃপ্তি।
অথচ এই মঞ্চে ওচোয়ার থাকাটাই তো এক অলৌকিক রূপকথা। কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের সেই বেদনার বিদায়ের পর অনেকে ভেবেছিলেন ‘সান মেমো’র (সাধু) অধ্যায় বুঝি শেষ। গত বছরের শেষ দিকেও তিনি ছিলেন মেক্সিকোর চার নম্বর গোলরক্ষক, পর্তুগাল ছাড়ার পর ছিলেন সম্পূর্ণ ক্লাবহীন। কিন্তু ওচোয়া হার মানতে শেখেননি।
বিশ্বকাপের দলে জায়গা করে নিতে ৪০ বছর বয়সে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাইপ্রাসের অখ্যাত ক্লাব এইএল লিমাসোলে। সেখানে ২৪টি ম্যাচ খেলে বুড়ো হাড়ের ভেল্কি দেখিয়ে প্রমাণ করেছিলেন নিবেদন। এরপর সতীর্থ লুইস আনহেল মালাগোনের চোট যেন ভাগ্যের লিখন হয়ে ওচোয়ার সামনে আসতেকার দরজা খুলে দিল।
চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ম্যাচ যখন ২-০ ব্যবধানে মেক্সিকোর নিয়ন্ত্রণে, তখনই গ্যালারি থেকে দাবি উঠল ওচোয়ার। খেলা শেষ হতে তখন ১২ মিনিট বাকি। চতুর্থ রেফারি যখন ১৩ নম্বর বোর্ডটি তুললেন, আসতেকার বুক চিরে যে গর্জন বের হলো, তা মেক্সিকোর যেকোনো গোল উদ্যাপনকেও হার মানায়।
মাঠে নামার প্রতিটি মুহূর্ত ওচোয়াকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল দুই দশক আগের এক অতীতে। ২০০৪ সালে এই আসতেকাতেই ক্লাব আমেরিকার হয়ে তাঁর পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরু। এরপর ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ফোর্তালেজায় নেইমারের সেই বুলেট গতির হেড ঠেকিয়ে রাতারাতি বিশ্ব জয় করা, স্বয়ং পেলে যে সেভটিকে তুলনা করেছিলেন সর্বকালের সেরা সেভের সঙ্গে।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ওচোয়া হয়ে উঠেছেন এক অতিমানবীয় দেয়াল। তার প্রমাণ মেলে ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপেও। সতীর্থ মাতেও শাভেজ তাই বলছিলেন, ‘সে আমাদের সবার জন্য এক বড় উদাহরণ। সে জিমে সবার আগে আসে এবং সবার শেষে বের হয়।’
ভাগ্য ওচোয়ার বিদায়ী চিত্রনাট্যটা লিখেছিল নিখুঁত কোনো কবির মতো। ম্যাচের শেষ দিকে আলভারো ফিদালগো যখন মেক্সিকোর হয়ে তৃতীয় গোলটি করলেন, ওচোয়া সবার আগে ছুটে গেলেন ডাগআউটের দিকে। জড়িয়ে ধরলেন কোচ হাভিয়ের আগিরেকে। যে মানুষটি ১৬ বছর আগে তাঁর মন ভেঙেছিলেন ২০১০ বিশ্বকাপে না খেলিয়ে, সেই মানুষটিই আজ তাঁকে এনে দিলেন এক রাজকীয় বিদায়।
পুরোনো সব ক্ষত ভুলে দুজনের সেই আলিঙ্গন যেন আসতেকার রাতকে আরও মায়াবী করে তুলল। শেষ বাঁশি বাজার পর ওচোয়া পরম মমতায় দুই গোলপোস্টে চুমু খেলেন, পেনাল্টি স্পটে হাঁটু গেড়ে বসে কেঁদে উঠলেন। সতীর্থরা তাঁকে কাঁধে তুলে আকাশে ছুড়ছিল। দিনশেষে ওচোয়া বলেন, ‘আমার প্রথম ম্যাচ আসতেকায়, আমার শেষ ম্যাচও আসতেকা। এটি আমার ক্যারিয়ারের এক সুন্দরতম শেষ অধ্যায়। সবাইকে ধন্যবাদ।’ ২০ বছরের এক দীর্ঘ সাধনার পর আসতেকা তাঁকে ঠিক সেটুকুই ফিরিয়ে দিল, যেটুকু তাঁর প্রাপ্য ছিল। বিদায় বেলায় গ্যালারির ওই চিৎকারই বলে দিচ্ছিল, ওচোয়া হারিয়ে যাচ্ছেন না; থেকে যাচ্ছেন মেক্সিকান ফুটবলের চিরন্তন দেয়াল হয়ে।