ক্রিস্টোফার কলম্বাসেরও শতবর্ষ আগে আটলান্টিক মহাসাগর জয় করেছিল তারা। সেই ভয়ংকর, ধূসর-চুলো নর্ডিক যোদ্ধারা কি তবে আবার ফিরে এলো?
ওসলোর এক নির্জন ফিয়র্ড নদীর তীর। পাশে নোঙর করা প্রাচীন নকশার দীর্ঘ যুদ্ধজাহাজ। তলোয়ার উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দীর্ঘ সোনালি চুলের এক ভয়ংকর যোদ্ধা, চোখে-মুখে জেদ আর আভিজাত্যের ছাপ। পাশে কুঠার ও ঢাল হাতে প্রস্তুত একদল আদিম যোদ্ধা। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে কোনো হলিউড সিনেমার সেট কিংবা ইতিহাসাশ্রয়ী কোনো সিরিজ। তবে একটু ভালো করে তাকালেই চেনা যাবে তলোয়ার হাতে থাকা সেই মূল চরিত্রকে—তিনি আর কেউ নন, বর্তমান ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা আর্লিং হালান্ড! আর তাঁর চারপাশের যোদ্ধারা হলেন নরওয়ে জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর ফুটবল বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ে। ১৯৯৮ সালের পর বৈশ্বিক মঞ্চে এই প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতেই এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (এনএফএফ)। গতানুগতিক সুট-টাই বা অফিসিয়াল জার্সি গায়ে জড়ানো ছবির বৃত্ত ভেঙে পুরো দলকে সাজানো হয়েছে তাদের পূর্বপুরুষ ‘ভাইকিং’ যোদ্ধাদের রূপে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেছেন আলোকচিত্র জগতের জীবন্ত কিংবদন্তি ডেভিড ইয়ারো। কালজয়ী এই ফ্রেমের নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য ভাইকিংস আর কামিং’ (ভাইকিংরা আসছে)।
নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন (এনএফএফ) মূলত তাদের দলীয় ছবিতে গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে এমন কিছু করতে চেয়েছিল, যা দেশটির হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে যায়। সম্প্রতি গ্যালারিতে নরওয়ের সমর্থকরাও এক অভিনব ‘ভাইকিং রো’ বা নৌকা বাইচের মতো সুসংগত অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শনের মাধ্যমে দলের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। সমর্থকদের এই জোয়ারকে মাঠের খেলোয়াড়দের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতেই এই আয়োজন। ছয় মাস আগে হালান্ড এবং গলফার ভিক্টর হভল্যান্ডের দেওয়া পরামর্শেই ডেভিড ইয়ারোর সঙ্গে যোগাযোগ করে এনএফএফ। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার ট্রফি জয়ের সেই কালজয়ী ছবির কারিগর ইয়ারো এই প্রস্তাব পেয়েই রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠেন।
ইয়ারো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, কোনো স্টুডিওর ভেতরে সস্তা বা যাত্রাপালার নাটুকে পোশাক দিয়ে এই কাজ হবে না। তিনি চেয়েছিলেন ভাইকিংদের সেই ঐতিহাসিক যাত্রার অনুভূতিটা ফুটিয়ে তুলতে যেন তারা আমেরিকার উদ্দেশ্যে নতুন কোনো অভিযানে বের হচ্ছে। তাই ওসলোর এক ব্যক্তিগত সৈকতে আনা হয়েছিল আসল কাঠের প্রাচীন লংবোট, এমনকি দৃশ্যটিকে আরও বাস্তবসম্মত করতে জলপ্রান্ত ছুঁয়ে তৈরি করা হয়েছিল একটি ঐতিহাসিক কাঠের জেটিও।
ইয়ারো বলেন, ‘খেলোয়াড়দের দেখে মনে হচ্ছে তারা যেন নর্ডিক পুরাণের পাতা থেকে সরাসরি উঠে এসেছে, আর শুরু থেকেই আমাদের উদ্দেশ্য ঠিক এটাই ছিল। নরওয়ের ‘জাতীয় সম্পদ’ আর্লিং হালান্ডের চেয়ে নিখুঁত ভাইকিং আর কেইবা হতে পারে! তাঁকে একজন যোদ্ধারূপে ফুটিয়ে তোলা ছিল আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সহজ কাজগুলোর একটি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে ছবিতে থাকা নৌকাগুলোর সত্যতা নিয়ে অনেকের মনেই সংশয় জাগতে পারে। তাই আমি এনএফএফে ধন্যবাদ জানাতে চাই বর্তমানে সচল ও সবচেয়ে চমৎকার ভাইকিং জাহাজগুলোর ব্যবস্থা করার জন্য।’
ঐতিহাসিক ফ্রেমে পুরো স্কোয়াডকে একসঙ্গে হাজির করা সহজ ছিল না। ফটোশুটের দিন (৩০ মে) ওসলোর সেই সৈকতে প্রায় সবাই উপস্থিত থাকলেও ছিলেন না কেবল দলের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। ঠিক সেদিনই আর্সেনালের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে লড়ছিলেন তিনি। তবে অধিনায়ককে ছাড়া কি আর আসল ফ্রেম জমে? ইয়ারো বুদ্ধি করে ছবিতে ওডেগার্ডের জন্য ঠিকঠাক জায়গা খালি রেখে বাকিদের শুট শেষ করেন। পরবর্তীতে ওসলোতে পা রাখতেই ওডেগার্ডের একক ছবি তুলে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় মূল লাইনে যুক্ত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডাগামী বিমানে ওঠার সময় অন্যান্য দেশের খেলোয়াড়দের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার একঘেয়েমি প্রসঙ্গে ইয়ারো বলেন, বিমানে ওঠার ছবিগুলো বড্ড একঘেয়ে। অন্তত নরওয়েজিয়ানরা বিশেষ কিছু করার জন্য প্রচলিত ধারার বাইরে গেছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে এটিই নিশ্চিতভাবে সেরা দলীয় ছবি। ফটোশুটের প্রমোদলগ্নে মজার ঘটনাও ঘটেছে। আরবি লাইপজিগের তরুণ উইঙ্গার আন্তোনিও নুসা হেলমেট খুলে তাঁর উজ্জ্বল সোনালি চুল দেখাতে ব্যস্ত ছিলেন। কোচ স্তালে সোলবাকেনের কঠোর ও গম্ভীর রূপ ছবিতে এনেছে নিখুঁত ভাইকিং যোদ্ধার আবহ।
এই ছবি কি কেবলই বাহ্যিক সৌন্দর্য নাকি এর পেছনে কোনো গভীর বার্তা রয়েছে? নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিসে ক্লাভেনেসের মতে, এটি মূলত দলের গভীর একতা ও মূল্যবোধের প্রতীক। ভাইকিং ন্যারেটিভ তাদের সঙ্গে জুড়ে থাকবেই, তাই তারা নিজেরাই এর মালিকানা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়, তাদের একতা ও দলীয় ভাবনার প্রতিফলন। দলে নানা খেলোয়াড় থাকলেও এই বৈচিত্র্যই তাদের আসল শক্তি।
এবার নরওয়ের খেলোয়াড়দের এই ছবি বিশাল ক্যানভাসে বাঁধিয়ে রাখা হবে নর্থ ক্যারোলিনার গ্রিন্সবোরোতে তাদের বিশ্বকাপ বেস ক্যাম্পে। বিশ্বকাপের মতো চরম মানসিক চাপের সময়েও যেন খেলোয়াড়রা এই সুন্দর ও আনন্দের দিনটি স্মরণ করে স্বস্তি পেতে পারেন।
বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘আই’তে নরওয়ের প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, সেনেগাল ও ইরাক। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই এই ছবি দিয়ে প্রতিপক্ষ শিবিরকে এক পরোক্ষ বার্তা দিয়ে রাখল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটি। ডেভিড ইয়ারোর বিশ্বাস, নরওয়ে এবার বিশ্বকাপে বড় ধরনের চমক দেখাতে পারে, কারণ গ্রুপ পর্ব থেকে দ্রুত নকআউটে কোয়ালিফাই করার মতো পর্যাপ্ত স্কোয়াড ডেপথ তাদের আছে। মাঠে বল গড়ানোর আগেই ভাইকিংদের এই হুংকার কি প্রতিপক্ষ শিবিরে কাঁপন ধরাতে পারবে? উত্তর দেবে সময়, তবে বিশ্বমঞ্চে ফেরার রাজকীয় ঘোষণায় নরওয়ে যে ইতিমধ্যেই সবার নজর কেড়ে নিয়েছে—তা বলাই বাহুল্য।