গ্রুপপর্বে আর্জেন্টিনার তিনটি ম্যাচের দুটিই পড়েছে ডালাসে । অথচ তাদের সমর্থকদের ভিড় বেশি ৯০০ কিলোমিটার দূরের কানসাস সিটিতে। কেন? কানসাসে আর্জেন্টিনা দলের বেসক্যাম্প । দল যেখানে, সমর্থকদের ভিড় সেখানেই হবে। ডালাসে আসার আগে কানসাসে থাকতেই দেখেছিলাম , মিসৌরি নদীর তীরে বার্কলি রিভারফ্রন্ট এলাকায় টিম হোটেলের আশপাশে আর্জেন্টাইনদের সারাক্ষণ ভিড় লেগেই থাকে।
সেখানে সমর্থকেরা ড্রাম বাজাচ্ছে , উল্লাস করছে । কোরাস তুলছে , ‘ওলে , ওলে ... ভামোস আর্হেন্তিনা!’ মেসিকে একনজর দেখতে কী যে অধীর অপেক্ষা । সারাটা দিন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেও কষ্ট নেই তাদের । মেসি মাঝে মাঝে ২-৪ সেকেন্ডের জন্য দেখা দেন ভক্তদের শান্ত রাখতে । কদিন আগে যেমন জানালার কাছে এসে হাত নাড়িয়ে গেলেন। মেসি যদি নাও দেখা দেন , উঁচু কাপড় দিয়ে ঘিরে রাখা প্রাচীরের ফাঁক বা ছিদ্র দিয়ে দলকে কোনোভাবে একনজর দেখে আশ মেটাচ্ছে ভক্তরা । দুদিন আগে হোটেলের লনে বসে সতীর্থদের সঙ্গে গল্প করছিলেন মেসি । হঠাৎ চিৎকার শোনা গেল — ‘মেসি ! মেসি !' আর্জেন্টিনার মহাতারকা তো অবাক , কে কোন ফাঁক দিয়ে তাঁকে দেখল , ডাকল । যে বা যারা ডাকছে, তাদের খুঁজতে বার কয়েক এদিক-ওদিক তাকালেন ।
আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ফুটবল নিয়ে পাগলামি এমনই। কেউ কেউ তো ক্যারাভ্যান বা মোটরহোম ভাড়া করেছে বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে ঘুরে আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখবে বলে। এরকম এক গাড়ির চালক রোমেরোর সঙ্গে কথা হয়েছিল কানসাসে থাকতে। তিনি জানিয়েছিলেন , তাঁরা সাতজনের একটা দল ভাড়া করেছেন গাড়িটা । মোটরহোমে যা যা থাকার সবই আছে । ঘুমানো বা বসার জায়গা তো আছেই । ছোট্ট রান্নাঘর , ফ্রিজ , জিনিসপত্র নিয়ে তাঁরা ছুটছেন এ - শহর থেকে ও - শহর ।
এই যে আর্জেন্টিনা দল দলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুযায়ী, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে ‘ আসাদো’র ( আর্জেন্টাইন বারবিকিউ ) আয়োজন করেছে, এ দৃশ্য দেখে অনেকে ৪০ বছর আগের ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনাদের বারবিকিউ করার দৃশ্যের তুলনা করেছেন। এক আর্জেন্টাইন সমর্থক দুই প্রজন্মের বারবিকিউ নিয়ে যা লিখেছেন , তা হুবহু তুলে দেওয়া যেতে পারে— ‘দুটি বারবিকিউর মাঝে কেটে গেছে ৪০ বছর । তবু ছবিটা যেন একই ; আগুনের চারপাশে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল । ১৯৮৬ সালে আমরা গৌরব অর্জনের সন্ধানে ছিলাম । এমন একটি দলের বারবিকিউ , যারা খুব শিগগির ছুঁয়ে ফেলতে যাচ্ছিল ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখর । আর ২০২৬ সালে আমরা আর কোনো অপূর্ণ স্বপ্নের পেছনে ছুটছি না । আমরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ; নিজেদের মুকুট রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছি । তবু চার দশক আগের মতোই আজও একই কাজ করছি — মাংস , অঙ্গার , আর আকাশি - সাদা রঙের আবেগ । আর্জেন্টাইন বারবিকিউ ( আসাদো ) আর আর্জেন্টিনার ফুটবল — দুটো একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ । একটিকে ছাড়া অন্যটি কল্পনাই করা যায় না ।’
দলের সঙ্গে একাত্মতা বজায় রাখতে আর নিজেদের রেওয়াজ অনুযায়ী আর্জেন্টাইন সমর্থকেরাও নিয়মিতই বারবিকিউ করছে । কানসাস সিটি যেন আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য - পশ্চিমাঞ্চলের একটি শহর নয় ; এটি এখন এক টুকরো আর্জেন্টিনা ! আর্জেন্টিনার হাজার হাজার সমর্থক এসেছে । কারও টিকিট আছে , আবার অনেকের নেই । কিন্তু তাদের কাছে এসব বড় বিষয় নয় । তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য , মেসি ও আর্জেন্টিনার পাশে থাকা।
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের এই উপস্থিতি শুধু ফুটবল ম্যাচকে ঘিরে নয় , বরং এটাকে বলা যায় মেসি ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে এক আবেগঘন ফুটবলীয় তীর্থযাত্রা । ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসির ছবিসংবলিত বড় বড় পতাকা , সারা রাতের উৎসব , হাজার হাজার ডলার ব্যয় আর সীমাহীন উচ্ছ্বাসই বলে দেয়, আর্জেন্টাইনদের কাছে ফুটবল শুধুই একটি খেলা নয় ; এটি তাদের সংস্কৃতি , পরিচয় ও বিশ্বাস।
যদি এবারের বিশ্বকাপে উপস্থিত থাকা মোটেও সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসানীতি , অগ্নিমূল্যে টিকিট ( বাংলাদেশি টাকায় ৪-৫ লাখ টাকাতেও মিলছে না অনেক সময় ), সফরের ব্যয় বহন করতে গিয়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কেউ নিজের গাড়ি বিক্রি করেছে, কেউ দ্বিতীয়বারের মতো বাড়ি বন্ধক রেখেছে। আবার কেউ দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে গাড়ি চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছে। তবু তাদের দুঃখ নেই , চোখভরে তারা লিওনেল মেসিকে দেখতে চায় , আর্জেন্টিনা জাদুকরের যে এটাই শেষ বিশ্বকাপ। মন ভরে তারা মেসির খেলা , আর্জেন্টিনার খেলা দেখতে চায়। কানসাস থেকে গত দুদিনে আর্জেন্টাইন দর্শকদের ঢল ডালাসমুখী। এখানেই গ্রুপপর্বের শেষ দুটি ম্যাচ তাদের। তার একটি শুরু আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১১ টায়। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আজ ডালাসের বিশাল গ্যালারি যে আকাশি- সাদায় রূপ নেব , তা কি আর বলতে !