ঘড়ির কাঁটায় তখন ৯৩ মিনিট। সান ফ্রান্সিসকোর গরমের চেয়েও ম্যাচের শেষ মুহূর্তের উত্তাপ যেন ছড়াল বেশি। গোটা স্টেডিয়াম যখন রেফারির শেষ বাঁশির অপেক্ষায়, ঠিক তখনই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল সুইজারল্যান্ডের নিশ্চিত জয়ের সব হিসেব। বুয়ালেম খুখির একটি বুলেট হেড থেকে শুধু ড্র-ই নয়, বিশ্বকাপের খাতায় প্রথমবার পয়েন্ট জমা করল কাতার। তাই ১-১ গোলের ড্রয়ের ম্যাচটি তাদের কাছে জয়ের চেয়ে কম কিছু নয়।
ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজার ঠিক দ্বিতীয় মিনিটে মারাত্মক ধাক্কা খেতে পারত সুইজারল্যান্ড। সুইস ডিফেন্ডার ম্যানুয়েল আকানজির এক ভুলে বক্সের ঠিক বাইরে বল পেয়ে যান কাতারের উইঙ্গার এদমিলসন জুনিয়র। সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলকে একা পেয়েও ওয়ান-টু-ওয়ান পজিশনে তিনি বল জালে জড়াতে ব্যর্থ হন। শুরুর এই ধাক্কা সামলে দ্রুতই মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের করে নেয় সবুজ জার্সি পরিহিত সুইজারল্যান্ড। ৫ ও ১০ মিনিটে সুইস ফরোয়ার্ড ড্যান এনদয়ে দুটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করলেও গোল করতে ব্যর্থ হন।
ম্যাচের ১৩তম মিনিটে আসে প্রথমার্ধের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত। বক্সের ভেতর রেমো ফ্রয়লারকে কাতারি গোলরক্ষক মাহমুদ আবুনাদা ফাউল করলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। টেলিভিশন রিপ্লেতে ফ্রয়লারকে কিছুটা অফসাইড মনে হওয়ায় ভিএআর দীর্ঘক্ষণ পরীক্ষা করে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। তবে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড গ্রাফিকটি মাঠে প্রদর্শন না করায় কিছুটা বিতর্ক তৈরি হয়।
১৬ মিনিটে ঠান্ডা মাথায় চমৎকার পেনাল্টি শটে আবুনাদাকে পরাস্ত করে সুইজারল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানের লিড এনে দেন অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড ব্রিল এম্বোলো।
৪২ মিনিটে কাতারের আকরাম আফিফের পাস থেকে এদমিলসনের নেওয়া নিচু শট দারুণভাবে রুখে দেন কোবেল। বিরতির ঠিক আগে ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল সুইজারল্যান্ড, তবে এবিশারের নেওয়া শট কাতারের ডিফেন্ডার আল আহমেদ গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করলে প্রথমার্ধ ১-০ ব্যবধানে শেষ হয়।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই অধিনায়ক গ্রানিত জাকার নেতৃত্বে কাতারকে চেপে ধরে সুইজারল্যান্ড। ৪৯ মিনিটে দূর থেকে জাকার একটি জোরালো শট গোলরক্ষকের আঙুল ছুঁয়ে কর্নারে পরিণত হয়। ম্যাচের ৬০ মিনিটের পর দুই দলই বেশ কিছু বদলি খেলোয়াড় মাঠে নামায়। সুইসদের হয়ে জোহান মানজাম্বি এবং কাতারের হয়ে অভিজ্ঞ হাসান আল হাইদোস মাঠে নামেন। ৭৫ মিনিটে রুবেন ভারগাস এবং এম্বোলো পরপর দুটি সুযোগ নষ্ট করলে ব্যবধান বাড়াতে পারেনি সুইজারল্যান্ড।
ম্যাচ যখন ৯০ মিনিটে গড়ায়, তখন চতুর্থ অফিশিয়াল ৬ মিনিটের অতিরিক্ত সময়ের সংকেত দেন। তীব্র গরমে ক্লান্ত সুইজারল্যান্ড যখন জয় নিশ্চিত ধরে নিয়ে ম্যাচ শেষের অপেক্ষা করছিল, ঠিক তখনই আসে সেই অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেডিয়ামে স্তব্ধতার চাদর বিছিয়ে দেয় কাতার। বাঁ দিক থেকে বল নিয়ে চমৎকারভাবে আক্রমণে ওঠেন আল আহমেদ। বক্সের ভেতর নিখুঁত এক ক্রস বাড়ান তিনি, আর সেখানে বাতাসে ভেসে আসা বলে এক বুলেট গতির হেডে কোবেলকে পরাস্ত করেন কাতারি সেন্টার ব্যাক বুয়ালেম খুখি। শেষ পর্যন্ত জয় হাতছাড়া হওয়ার একরাশ আক্ষেপ নিয়ে মাঠ ছাড়ে সুইজারল্যান্ড, আর কাতার মাঠ ছাড়ে ঐতিহাসিক এক ড্রয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে। এর আগে গত বিশ্বকাপে ৩ ম্যাচ খেলে একটিতেও জয়ের মুখ দেখেনি কাতার।