১১ জুন শুরু ফুটবল বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮ দল। ‘বিশ্বকাপের দল' শীর্ষক এই ধারাবাহিকে কোন দল কেমন, সেটি তুলে ধরার প্রয়াস। আজকের পর্বে চেক প্রজাতন্ত্র চেকিয়ার আছে অদম্য জেদ
ফুটবল বিধাতা বোধ হয় চেক প্রজাতন্ত্রের জন্য এক রোমাঞ্চকর চিত্রনাট্য আগেই লিখে রেখেছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট পেতে তাদের যে পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, তা কোনো মহাকাব্যিক যুদ্ধের চেয়ে কম নয়। টানা দুটি প্লে-অফ ম্যাচ, দুটিতেই অতিরিক্ত সময়ের স্নায়ুচাপ এবং দুবারই পেনাল্টি শুটআউটের অগ্নিপরীক্ষা—সব বাধা টপকে দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বমঞ্চে ফিরছে চেক প্রজাতন্ত্র।
বাছাইপর্বে চেক প্রজাতন্ত্রের যাত্রাটা মোটেও মসৃণ ছিল না। গ্রুপ ‘এল’-এ ক্রোয়েশিয়ার পেছনে থেকে দ্বিতীয় হওয়া এবং পুঁচকে ফ্যারো আইল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলের সেই অবিশ্বাস্য হার দলটিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছিল। সেই ব্যর্থতায় ইভান হাসেক যখন চাকরি হারালেন, তখন হাল ধরলেন ৭৪ বছর বয়সী কোচ মিরোস্লাভ কোউবেক। তাঁর হাত ধরেই প্রাগের মাটিতে রচিত হলো নতুন ইতিহাস।
প্লে-অফের সেমিফাইনালে রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে শুরুতে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়া চেক প্রজাতন্ত্র যখন হারের শঙ্কায়, তখন ত্রাতা হয়ে আসেন প্যাত্রিক শিক এবং অধিনায়ক লাদিস্লাভ ক্রেচি। নাটকীয়ভাবে ম্যাচে ফিরে পেনাল্টি শুটআউটে জয় পায় তারা। এরপর ফাইনাল প্লে-অফে ডেনমার্কের মুখোমুখি। সেখানেও চিত্রনাট্য বদলায়নি। ২-২ গোলের সমতার পর টাইব্রেকারে ড্যানিশদের তিনটি শট রুখে দিয়ে উল্লাসে মাতে চেকিয়া। ইপেট এরিনার ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠান্ডায় তখন হাজারো দর্শক জামা খুলে উন্মাতাল উৎসবে মেতেছিলেন। পেনাল্টি জয়ের পর প্রাগের আকাশ লাল হয়ে উঠেছিল ফ্লেয়ারের আলোয়।
শূন্য দশকের সেই সোনালি প্রজন্মের চেকিয়া দল এটি নয়। নেই পাভেল নেদভেদের মতো ব্যালন ডি’অর জয়ী মহাতারকা, নেই পিওতর চেকের মতো অতন্দ্র প্রহরী। বর্তমান দলের অধিনায়ক ক্রেচি প্রিমিয়ার লিগের তলানির দল উলভসের হয়ে লড়ছেন, টমাস সুচেক লড়ছেন রেলিগেশন বাঁচাতে। অথচ এই ‘সাধারণ’ খেলোয়াড়েরাই তাঁদের অদম্য মানসিকতা, জেদ এবং অনুপ্রেরণা দিয়ে অসাধ্য সাধন করেছেন। বিশেষ করে পাভেল সুলক লিঁও-র হয়ে দারুণ ফর্মে থেকে দলের আক্রমণের মূল ভরসা হয়ে উঠেছেন। এ ছাড়া লুকাস প্রোভোদের মতো সৃজনশীল মিডফিল্ডার আর টমাস চরীর শারীরিক শক্তির ফুটবলই এখন চেক দলের প্রধান হাতিয়ার।
ইতিহাস বলছে, চেকোস্লোভাকিয়া হিসেবে ১৯৩৪ এবং ১৯৬২ সালে তারা দুবার বিশ্বকাপের রানার্সআপ হয়েছিল। সেই ঐতিহ্য ফেরানো কঠিনই। ২০২৬ বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ ‘এ’-তে লড়বে সহআয়োজক মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে। বিশ্বকাপে উঠে মিরোস্লাভ কোউবেক যখন অশ্রুসিক্ত নয়নে বলছিলেন, ‘এটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সাফল্য।’ তখন বোঝা যাচ্ছিল একটি জাতির ২০ বছরের দীর্ঘশ্বাসের মুক্তি।
তারা মাঠের লড়াইয়ে প্রমাণ করেছে, সব সময় সেরা দল জেতে না, দিনশেষে জেতে তারাই যারা জিততে বেশি মরিয়া থাকে। প্রাগের সেই জাদুকরি রাত চেক ফুটবলে এক নতুন সূর্যোদয়ের বার্তা দিয়ে গেল। আসল লড়াই এখন উত্তর আমেরিকার সবুজ গালিচায়, যেখানে ‘আন্ডারডগ’ তকমা নিয়ে আবারও বিশ্বকে চমকে দিতে প্রস্তুত মিরোস্লাভ কোউবেকের শিষ্যরা।
কোচ
মিরোস্লাভ কোউবেক
৭৪ বছর বয়সী এই কোচ গত বছরের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেন। বাছাইপর্বে ফারো আইল্যান্ডের কাছে কাছে অভাবনীয় হারের পর বরখাস্ত হওয়া ইভান হাসেকের স্থলাভিষিক্ত হন মিরোস্লাভ কোউবেক। খেলোয়াড়ি জীবনে কোউবেক একজন গোলরক্ষক ছিলেন, বিশেষ করে স্পার্তা প্রাগের হয়ে খেলেছেন । আশির দশকের শুরুতে তিনি কোচিং জীবন শুরু করেন। কোউবেক হতে যাচ্ছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে বয়স্কতম কোচ। আগের রেকর্ডটি ছিল অটো রেহাগেলের। ২০১০ বিশ্বকাপে ৭১ বছর বয়সে গ্রিসের ডাগআউটে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।
তারকা প্যাত্রিক শিক
প্যাত্রিক শিক এখন চেক প্রজাতন্ত্রের আক্রমণভাগের সবচেয়ে বড় ভরসা। ২০২০ ইউরোতে মাঝমাঠ থেকে করা সেই অবিশ্বাস্য গোলের পর থেকে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোচনায়। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট কাটার পেছনেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। প্লে-অফে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে যখন দল ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল, তখন পেনাল্টি থেকে ঠান্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে তিনিই প্রথম গোলের খাতা খুলে দলকে ম্যাচে ফেরান। বর্তমানে বায়ার লেভারকুসেনে খেলা এই ফরোয়ার্ডের ফিটনেস আর গোল করার সহজাত ক্ষমতাই উত্তর আমেরিকায় চেক রূপকথা এগিয়ে নেওয়ার মূল অস্ত্র।
র্যাঙ্কিং: ৪১
অঞ্চল: ইউরোপ
সর্বোচ্চ সাফল্য: রানার্সআপ (১৯৩৪, ১৯৬২)
অংশগ্রহণ: ১০
বিশ্বকাপে চেক প্রজাতন্ত্র
ম্যাচ জয় ড্র হার
৩৩ ১২ ৫ ১৬
১২ জুন দক্ষিণ কোরিয়া গুয়াদালাহারা সকাল ৮টা
১৮ জুন দক্ষিণ আফ্রিকা আটলান্টা রাত ১০টা
২৫ জুন মেক্সিকো মেক্সিকো সিটি সকাল ৭টা