১৯৮৬ সালের ২৯ জুন মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। কার্লোস বিলার্দোর অধীনে গড়া সেই ঐতিহাসিক দলকে ঘিরে চার দশক পরও ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ কমেনি। দিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরি পারফরম্যান্সের পাশাপাশি সেই দলে থাকা ২২ জন খেলোয়াড়ের প্রায় সবাই ফুটবলের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত থেকেছেন—কেউ কোচ, কেউ বিশ্লেষক, কেউ প্রশাসনে। কয়েকজন আবার না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
গোলরক্ষক:
নেরি পামপিদো (৬৮ বছর)
সেবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সাত ম্যাচের সবকটিতেই মূল গোলরক্ষক ছিলেন নেরি পামপিদো। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি মাত্র পাঁচটি গোল হজম করেন। ১৯৯০ বিশ্বকাপে অংশ নিলেও দ্বিতীয় ম্যাচে চোট পেয়ে ছিটকে যান। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কার্লোস বিলার্দোর সহকারী কোচ হিসেবে বোকা জুনিয়র্সে কাজ করেন তিনি। পরবর্তীতে প্রধান কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন পামপিদো। বর্তমানে তিনি কনমেবলের ফুটবল উন্নয়ন বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল ও ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন।
লুইস ইসলাস (৬০ বছর)
পামপিদোর ব্যাকআপ গোলরক্ষক ছিলেন লুইস ইসলাম। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচিংয়েও দেখা গেছে তাঁকে। কার্লোস বিলার্দোর সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ১৯৯০ বিশ্বকাপে দলে ছিলেন না ইসলাস। তবে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ম্যারাডোনার সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করেন। সবশেষ ২০২৫ সালে পেরুর আয়াকুচো ক্লাবে কোচিং করিয়েছেন ইসলাস। বর্তমানে তিনি একটি কোচিং স্কুল পরিচালনা করেন এবং ইনডিপেনডিয়েন্তের নির্বাচনে অংশ নিতে একটি রাজনৈতিক গ্রুপের সঙ্গেও যুক্ত আছেন।
হেক্তর জিলাদা (৬৯ বছর)
পামপিদোর আরেকজন ব্যাকআপ ছিলেন হেক্তর জিলাদা। মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকা ও আটলান্তেতে খেলে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন আর্জেন্টিনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য। বর্তমানে তিনি মেক্সিকান মিডিয়ায় ধারাভাষ্যকার ও বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন। চলমান বিশ্বকাপেও তিনি মিডিয়ায় সঙ্গে কাজ করছেন।
ডিফেন্ডার:
হোসে লুইস ব্রাউন (২০১৯ সালে মৃত্যু, বয়স ৬২)
ফাইনালে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছিলেন হোসে লুইস ব্রাউন। বিশ্বকাপের পর তিনি ফ্রান্সের ব্রেস্ট, স্পেনের রিয়াল মুরসিয়া এবং আর্জেন্টিনার রেসিং ক্লাবে খেলেন। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে বিলার্দোর সহকারী কোচ হিসেবে বোকা জুনিয়র্স ও এস্তুদিয়ান্তেসে কাজ করেছেন ব্রাউন। পরবর্তীতে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচিং স্টাফেও কাজ করেছেন। ২০১৯ সালে নিউরোডিজেনারেটিভ রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ব্রাউন।
দানিয়েল পাসারেল্লা (৭৩ বছর)
দলে থাকলেও গুরুতর গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিসের কারণে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি দানিয়েল পাসারেল্লা। ইতালির ফিওরেন্তিনা ও ইন্টার মিলানে খেলার পর ১৯৮৮ সালে রিভার প্লেটে ফিরে আসেন এবং খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেন। ১৯৯০ সালে কোচিং শুরু করেন পাসারেল্লা। ১৯৯৪–১৯৯৮ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এরপর উরুগুয়ে, পারমা, মন্টেরে, করিন্থিয়ান্সসহ বিভিন্ন দল পরিচালনা করেন সাবেক এই ডিফেন্ডার।
২০০৯ সালে রিভার প্লেটের সভাপতি নির্বাচিত হন পাসারেল্লা। তাঁর মেয়াদে ক্লাবটি ২০১১ সালে ইতিহাসে প্রথমবার দ্বিতীয় বিভাগে নেমে যায়। ২০১৩ সালে তাঁর মেয়াদ শেষ হয়। বর্তমানে তিনি ফুটবলের বাইরে থাকলেও সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়।
নেস্তর ক্লাউসেন (৬৩ বছর)
১৯৮৬ বিশ্বকাপে মাত্র একটি ম্যাচ খেলেন নেস্তর ক্লাউসেন। কোচ হিসেবে তিনি বলিভিয়া, ইকুয়েডর, পেরু, সুইজারল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বহু দেশে কাজ করেছেন। সবশেষ ২০২২ সালে ব্লুমিং ক্লাবের কোচিং করিয়েছেন তিনি।
হোসে লুইস কুসিউফো (২০০৪ সালে মৃত্যু, বয়স ৪৩)
ছয়টি ম্যাচ খেলেন হোসে লুইস কুসিউফো। পরে ক্লাব পর্যায়ে বোকা জুনিয়র্স, ফ্রান্সের নীম ও বেলগ্রানোতে খেলেন এবং ১৯৯৩ সালে অবসর নেন। ২০০৪ সালে শিকার করতে গিয়ে একটি দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।
অস্কার গারে (৬৫ বছর)
চার ম্যাচে মাঠে নামেন অস্কার গারে। এরপর হুরাকান ও ইসরায়েলে খেলেছেন। কোচ হিসেবে লানুস, হুরাকান ও ফেরোর মতো ক্লাব পরিচালনা করেন। আর্জেন্টিনার যুব দলের হয়েও কাজ করার অভিজ্ঞতা আছেন তাঁর।
অস্কার রুগেরি (৬৪ বছর)
একবার জালের দেখা পান অস্কার রুগেরি। বিশ্বকাপের পর রিয়াল মাদ্রিদসহ বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন এবং ১৯৯০ ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও অংশ নেন। ১৯৯৭ সালে লানুসে অবসর নেন রুগেরি। পরবর্তীতে কোচিং করিয়েছেন। বর্তমানে ইএসপিএনে নিয়মিত বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন।
মিডফিল্ডার:
সার্জিও বাতিস্তা (৬৩ বছর)
সাত ম্যাচেই খেলেছেন সার্জিও বাতিস্তা। ১৯৯০ বিশ্বকাপের দলেও ছিলেন তিনি। ১৯৯৯ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেন বাতিস্তা। কোচ হিসেবে আর্জেন্টিনার অলিম্পিক দলকে ২০০৮ সালে স্বর্ণ এনে দেন। ২০১০-২০১১ সালে জাতীয় দলের কোচ ছিলেন। বর্তমানে ভেনেজুয়েলা ফুটবল ফেডারেশনে স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন বাতিস্তা।
রিকার্দো বোচিনি (৭২ বছর)
১৯৮৬ বিশ্বকাপে মাত্র একটি ম্যাচ খেলেন রিকার্দো বোচিনি। পুরো ক্যারিয়ার কাটান ইনডিপেনডিয়েন্তেতে, সেখান থেকে ১৯৯১ সালে অবসর নেন। পরবর্তীতে তিনি ক্লাবটির কোচিং স্টাফে কাজ করেন। বর্তমানে ফুটবল বিশ্লেষক এবং বিশ্বকাপ চলাকালে একটি মোটরহোমে ভ্রমণ করে আলোচনায় আছেন বোচিনি।
ক্লদিও বোর্গি (৬১ বছর)
দুটি ম্যাচ খেলেন ক্লদিও বোর্গি। এরপর এসি মিলান, রিভার প্লেট, ইনডিপেনডিয়েন্তে ও হুরাকানের মতো ক্লাবে খেললেও স্থায়ীভাবে জায়গা করতে পারেননি। ১৯৯৮ সালে চিলিতে অবসর নেন বোর্গি। কোচ হিসেবে কোলোকোলো, ইনডিপেনডিয়েন্তে, আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স (চ্যাম্পিয়ন) ও বোকা জুনিয়র্সের হয়ে কাজ করেছেন। চিলির কোচও ছিলেন তিনি। বর্তমানে ইএসপিএন ও টেলেমুন্ডোতে টিভি বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন।
হোর্হে বুরুচাগা (৬৩ বছর)
সাত ম্যাচে খেলে দুটি গোল করেন বুরুচাগা। ক্লাব পর্যায়ে ইনডিপেনডিয়েন্তের আইকন ছিলেন এবং ফ্রান্সেও খেলেছেন। কোচ হিসেবে ডিফেন্সা ই হুস্তিসিয়া, আর্সেনাল, ইনডিপেনডিয়েন্তে ও এস্তুদিয়ান্তেসসহ বিভিন্ন ক্লাবে কাজ করেছেন। ২০১৬ সালে সারমিয়েন্তো দে জুনিনের হয়ে সবশেষ কোচিং করিয়েছেন তিনি।
দিয়েগো ম্যারাডোনা (২০২০ সালে মৃত্যু, বয়স ৬০)
দিয়েগো ম্যারাডোনা ছিলেন আর্জেন্টিনার ১৮৮৬ বিশ্বকাপজয়ী দলের প্রাণ। সাত ম্যাচে পাঁচ গোল করেন এই কিংবদন্তি ফুটবলার। পরবর্তীতে আরও দুটি বিশ্বকাপে খেলেন তিনি। ১৯৯১ সালে নাপোলি ছাড়ার পর সেভিয়া, নিউওয়েলস ও বোকা জুনিয়র্সে খেলেন। ১৯৯৭ সালে অবসর নেন ম্যারাডোনা। তাঁর কোচিংয়ে ২০১০ বিশ্বকাপ খেলেছে আর্জেন্টিনা। পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মেক্সিকো ও গিমনাসিয়া লা প্লাতায় কাজ করেন। ২০২০ সালে না ফেরার দেমে পাড়ি জমান ম্যারাডোনা।
রিকার্দো গিউস্তি (৬৯ বছর)
সাত ম্যাচই খেলেন রিকার্দো গিউস্তি। ১৯৯০ বিশ্বকাপের দলেও ছিলেন তিনি। ১৯৯২ সালে ইউনিয়নে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেন। পরে তিনি ফুটবল এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন।
হেক্তর এনরিকে (৬৪ বছর)
পাঁচটি ম্যাচ খেলেন হেক্তর এনরিকে। ১৯৮৬ সালের পর রিভার প্লেটের হয়েও শিরোপা জেতেন। পরে চোটের কারণে তাঁর ক্যারিয়ার থেমে যায়। পরবর্তীতে তিনি কোচিংয়ে যুক্ত হন এবং ম্যারাডোনার সহকারী স্টাফেও কাজ করেছেন।
হোর্হে ওলার্তিকোয়েচেয়া (৬৭ বছর)
সব ম্যাচ খেলেছিলেন হোর্হে ওলার্তিকোয়েচেয়া। ফাইনালে ছিলেন শুরুর একাদশে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর গোললাইন ক্লিয়ারেন্স ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ১৯৯৩ সালে ডিপোর্তিভো ম্যান্ডিয়ুতে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেন। পরে ২০১৬ রিও অলিম্পিকে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কোচ ছিলেন ওলার্তিকোয়েচেয়া।
কার্লোস তাপিয়া (৬৩ বছর)
মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেছিলেন কার্লোস তাপিয়া। ক্লাব পর্যায়ে বোকা জুনিয়র্সসহ বিভিন্ন দলে খেলেন এবং সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সেও খেলেছেন। ১৯৯৪ সালে অবসর নেন তিনি। পরে তিনি টিভি প্যানেলিস্ট হন এবং সরকারি ক্রীড়া দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন।
মার্সেলো ত্রোবিয়ানি (৭১ বছর)
একটি ম্যাচ খেলেন মার্সেলো ত্রোবিয়ানি। স্পেন, আর্জেন্টিনা, চিলি ও ইকুয়েডরের ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। ১৯৯৪ সালে লাফেরেরেতে অবসর নেন। বোকা জুনিয়র্সের কোচিং স্টাফে কাজ করেন এবং আর্জেন্টিনার যুব দলও পরিচালনা করেছেন। সবশেষ ২০২৩ সালে বার্সেলোনা দে ইকুয়েডরের যুব একাডেমির সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন।
ফরোয়ার্ড:
হোর্হে ভালদানো (৭০ বছর)
সাত ম্যাচে চারটি গোল করেছিলেন হোর্হে ভালদানো। ১৯৮৭ সালে ফুটবল ছাড়েন তিনি। পরে কোচিংয়ে যুক্ত হন এবং রিয়াল মাদ্রিদসহ বিভিন্ন ক্লাবের ডাগআউটে বসেন। লেখক হিসেবেও পরিচিত তিনি। এমনকি ফুটবলের দার্শনিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। এ ছাড়া রিয়াল মাদ্রিদের স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
পেদ্রো পাস্কুলি (৬৬ বছর)
দুই ম্যাচ খেলে একটি গোল করেন পেদ্রো পাস্কুলি। বিশ্বকাপের পর দীর্ঘদিন ইতালির লেচ্চেতে খেলেন সাবেক এই ফুটবলার। পরে আর্জেন্টিনা, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও ইতালির বিভিন্ন ক্লাবে খেলে অবসর নেন। কোচ হিসেবে ইতালির নিম্ন বিভাগ, উগান্ডা ও আলবেনিয়ার জাতীয় দলেও কাজ করেচেন তিনি।
সার্জিও আলমিরন (৬৭ বছর)
বিশ্বকাপ দলের অংশ হলেও কোনো ম্যাচ খেলেননি সার্জিও আলমিরন। পরে ফ্রান্স ও মেক্সিকোতে খেলেন এবং আর্জেন্টিনায় ফিরে নিউওয়েলসসহ বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন।
কোচ:
কার্লোস বিলার্দো (৮৮ বছর)
১৯৯০ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার কোচ ছিলেন কার্লোস বিলার্দো। এরপর সেভিয়া, বোকা জুনিয়র্স ও এস্তুদিয়ান্তেসে কোচিং করিয়েছেন। টিভি শো, রেডিও, রাজনীতি ও ফুটবল প্রশাসনেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে নিউরোডিজেনারেটিভ রোগে আক্রান্ত হন এবং বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটছে তাঁর।