প্রথম ইনিংসের শেষটা যেভাবে হয়েছিল, দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিংটা চলছে সেভাবেই। ৫১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে প্রথম ইনিংসে ২৭২ রানে গুটিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে উইকেট পড়েছে মুড়ি মুড়কির মতো। মিরপুরে সিরিজের প্রথম টেস্টে লিডসহ স্বাগতিকদের স্কোর ১০০ পেরোলেও পড়ে গেছে ৬ উইকেট।
বৃষ্টির বাগড়া-আলোক স্বল্পতার সমস্যা দেখা গেছে আজও। কোনো দিনই পূর্ণ ৯০ ওভার হতে পারেনি। যেখানে ২৭০ ওভার খেলা হওয়ার কথা, সেখানে হয়েছে ২০৯.৩ ওভার। দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯ ওভারে ৬ উইকেটে ৭৯ রানে বাংলাদেশ আজ তৃতীয় দিনের খেলা শেষ করেছে। নাঈম হাসান, জাকের আলী দুজনেই ১৮ রানে অপরাজিত।
শুধু তাই নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিরপুরে বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম টেস্টের উইকেট স্পিনবান্ধব হয়ে উঠছে। বেশির ভাগ সময় বল নিচু হয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় বোল্ড বা এলবিডব্লুর ঝুঁকি থাকে। এখন পর্যন্ত ২৬ উইকেটের মধ্যে ২০টিই নিয়েছেন স্পিনাররা। বাকি ৬ উইকেট পেয়েছেন পেসাররা। শেরেবাংলায় সর্বোচ্চ ২০৯ রান তাড়া করে চতুর্থ ইনিংসে জয়ের কীর্তি রয়েছে ইংল্যান্ডের। ২০১০ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে জেতে এভাবে ইংলিশরা জেতে ৯ উইকেটে। এবার বাংলাদেশ ২০০ পেরোতে পারলেই অনেকটা এগিয়ে থাকবে।
প্রথম ইনিংসে ৪৮ ওভারে ৪ উইকেটে ১৩৪ রান করে আজ তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দিনের খেলা শুরুর ৬২ বলে উইকেটের দেখা পায় বাংলাদেশ। মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা তেজনারায়ণ চন্দরপলকে ফেরান শরীফুল ইসলাম। ৫৯তম ওভারের তৃতীয় বলে শরীফুলকে খোঁচা দিতে গিয়ে চন্দরপল দ্বিতীয় স্লিপে দাঁড়িয়ে থাকা নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ক্যাচ তুলে দেন।
১৮৪ বলে ৬ চার ও ১ ছক্কায় ৫৬ রানে আউট হয়েছেন চন্দরপল। অধিনায়ক রস্টন চেজ ও গ্রিভস ধীরস্থির ব্যাটিং করতে থাকেন। লাঞ্চের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাত উইকেটই পড়তে পারত। ৭৩তম ওভারের চতুর্থ বলে নাঈমকে গ্ল্যান্স করতে যান চেজ। শর্ট লেগে দাঁড়িয়ে থাকা মুমিনুল হক ডান দিকে ঝাঁপালেও নাগাল পাননি। চেজের রান তখন ২৮। উইন্ডিজ ষষ্ঠ উইকেট হারাতে পারত ২১০ রানে।
এক ওভার বিরতিতে নাঈম বোলিংয়ে এসে উইকেটের দেখা পেয়েছেন। ফিফটির পথে থাকা গ্রিভসকে এলবিডব্লউ করেন নাঈম। ১০৩ বলে ২ চারে ৪৬ রান করেন গ্রিভস। তাতে ভেঙে যায় ষষ্ঠ উইকেটে গ্রিভস-চেজের ৯৯ বলে ৫১ রানের জুটি।
তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশনের খেলা যখন শুরু হয়, তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের স্কোর ৭৪.৫ ওভারে ৬ উইকেটে ২১৩ রান। মাত্র ৩২ রান যোগ করতেই শেষ ৪ উইকেট হারিয়ে ২৪৫ রানে গুটিয়ে যায় উইন্ডিজ। যার মধ্যে অষ্টম থেকে দশম—এই ৩ উইকেট কোনো রান যোগ না করেই হারায় ক্যারিবীয়রা। এই তিনটিই নিয়েছেন নাঈম হাসান।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮২.৫ ওভারে ২৪৫ রানে গুটিয়ে যায়। ইনিংস সর্বোচ্চ ৫৬ রান আসে তেজনারায়ণ চন্দরপলের ব্যাটে। জন ক্যাম্পবেল করেন ৫৪ রান। বাংলাদেশের নাঈম নিয়েছেন ৪ উইকেট। মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম পেয়েছেন দুটি করে উইকেট। একটি করে উইকেট নিয়েছেন শরীফুল ও হাসান মাহমুদ। লিটন দাস গতকাল উইকেটরক্ষক হিসেবে খেলতে না পারলেও আজ তৃতীয় দিনে উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়েছেন।
বাংলাদেশ পায় ২৭ রানের লিড। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১ রানেই প্রথম উইকেট হারায় স্বাগতিকেরা। দ্বিতীয় ওভারের দ্বিতীয় বলে জেইডেন সিলসকে লেগ সাইডে ঘোরাতে যান তানজিদ হাসান তামিম। এজ হওয়া বল দ্বিতীয় স্লিপে সহজেই ধরেছেন রস্টন চেজ। তামিম এবার ২ বল খেলেও কোনো রান করতে পারেননি।
তিন নম্বরে ব্যাটিংয়ে নামেন শান্ত। মুমিনুলের নামার কথা থাকলেও ফিল্ডিংয়ের সময় চোট পেয়ে ম্যাচ থেকেই ছিটকে যান তিনি। ওপেনার সাদমান ইসলাম এবং শান্ত সাবলীলভাবে খেলতে থাকেন। দ্বিতীয় উইকেটে ৫৩ বলে ২৭ রানের জুটি গড়েন সাদমান-শান্ত। ১১তম ওভারের প্রথম বলে চেজের ভেতরে ঢোকা বল ডিফেন্স করতে যান সাদমান। ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে বল আঘাত হানে স্টাম্পে।
১৩ রান করে সাদমানের বিদায়ের পর ব্যাটিংয়ে নামেন হৃদয়। ১১তম ওভারের তৃতীয় বলে চেজকে ক্রস ব্যাটে খেলতে যান হৃদয়। টাইমিংয়ে গড়বড় হওয়া বল মিড অনে সহজেই তালুবন্দী করেন সিলস। ২ বল খেলেও রানের খাতা খুলতে পারেননি বাংলাদেশের এই মিডল অর্ডার ব্যাটার। এমনকি ধারাভাষ্যকক্ষে থাকা আতহার আলী খানও বলে ওঠেন, ‘এমন অবস্থায় হৃদয় এমন একটা শট খেলেছে, তা সত্যিই বিশ্বাস করা কঠিন। বিশেষ করে একই ওভারে এর আগে সাদমান আউট হয়েছে।’
হৃদয়ের বিদায়ের পর ব্যাটিংয়ে নামেন জাকের আলী অনিক। ছিটকে যাওয়া মুমিনুলের কনকাশন সাব হিসেবে নামেন জাকের। নতুন ব্যাটার আসার অল্প সময়ের মধ্যেই বিদায় নেন শান্ত। ১৩তম ওভারের চতুর্থ বলে শান্তকে (১০) এলবিডব্লুর ফাঁদে ফেলেন চেজ। রিভিউতে দেখা যায়, তিনটা লাল বাতি যদিও বল লেগ স্টাম্পে আঘাত হেনেছে। ফল নষ্ট হয়ে যায় রিভিউ।
৫ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ৪ উইকেটে ৩৩ রানে পরিণত হয় বাংলাদেশ। জাকের এসে কেবল এক বল খেলতে পেরেছেন। তখনই নামে বৃষ্টি। যার ফলে ২টা ১০ মিনিটে দ্বিতীয় সেশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চা পানের বিরতি দেওয়া ২টা ৫ মিনিটে।
দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩ ওভারে ৪ উইকেটে ৩৪ রান থেকে শেষ সেশনের খেলা শুরু করতেই বাংলাদেশ আরও এক উইকেট হারায়। ১৪তম ওভারের চতুর্থ বলে লিটনকে (৪) এলবিডব্লুর ফাঁদে ফেলেন ওয়ারিকান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাঁহাতি স্পিনার দ্রুতই এরপর মিরাজকে (৯) ফিরিয়েছেন। ২২তম ওভারের চতুর্থ বলে ওয়ারিকানের বল যতটা না চমৎকার, তার চেয়ে দায়টা বেশি মিরাজের। রং লাইনে ডিফেন্স করতে গিয়ে বোল্ড হয়েছেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ অলরাউন্ডারের।
৫৩ রানে ৬ উইকেটে পরিণত হওয়া বাংলাদেশ ৬৪ রানে হারাতে পারত সপ্তম উইকেট। ২৭তম ওভারের চতুর্থ বলে নাঈমের বিপক্ষে বিশপ এলবিডব্লুর আবেদন করতেই আঙুল তুলে দেন আম্পায়ার। নাঈম সঙ্গে সঙ্গে রিভিউ নিলে দেখা যায়, আগে ব্যাট ছুঁয়ে তারপর প্যাডে আঘাত হেনেছে।
বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৩২ মিনিটে আলোকস্বল্পতার কারণে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও পড়তে থাকে। তবে আলোর সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ৪টা ৩০ মিনিটে কাভার নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯ ওভারে ৬ উইকেটে ৭৯ রান করার পর শেষ তৃতীয় দিনের খেলা।