অনুজ সতীর্থদের সঙ্গে নুরুল হাসান সোহানকে দেখলে মনে হয়, বিদেশের শহরে তাঁর ভূমিকা দায়িত্বশীল ‘বড় ভাইয়ে’র মতো। এটাই হয়। অনুজেরা দলের অভিজ্ঞ সতীর্থের শরণ নেবেন, নতুন কী! শুধু দলের সতীর্থরা কেন, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরাও সোহানকে দেখলেই এগিয়ে আসেন, হাসিমুখে কুশলাদি জানতে চান। বাংলাদেশ দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার বলেই নয়, সোহান বিপিএলের দল রংপুর রাইডার্স ও ডিপিএলের দল শেখ জামাল ধানমন্ডি দলের অধিনায়ক।
বিপিএলে আফগানিস্তান-শ্রীলঙ্কার অনেক ক্রিকেটারই রংপুরে খেলায় সোহানেরও পরিচিত। মাঠের বাইরে বাংলাদেশ দলের অভিজ্ঞ উইকেটকিপারের স্বপ্রতিভ উপস্থিতি থাকলেও এই টুর্নামেন্টও যেন তাঁর কাছে আরেকটি ‘শিক্ষাসফর’ হতে চলেছে। চার ম্যাচের মাত্র একটিতে জায়গা পেয়েছেন একাদশে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবিতে সুযোগ পাওয়া সোহানের পারফরম্যান্স কি প্রশ্নবিদ্ধ বলার সুযোগ আছে? গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ৬ বলে করেছিলেন অপরাজিত ১২ রান। ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়া একটা রানআউট করেছেন। তবু কাল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একাদশে তাঁর জায়গা মেলেনি।
মেলেনি সমন্বয়ের কারণে। দুবাইয়ের কন্ডিশন বিবেচনায় একাদশে ফিরেছেন স্পিনিং অলরাউন্ডার শেখ মেহেদী হাসান। আফগানিস্তানের বিপক্ষে পাঁচ স্বীকৃত বোলার নিয়ে খেলায় সমালোচিত হতে হয়েছিল, এ কারণে দুটি পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশের বোলিং বিভাগে। একজন স্পিনারকে জায়গা দিতে সোহানকে বসতে হয়েছে। কিন্তু একজন ব্যাটার পরিবর্তন করে কি সোহানকে জায়গা দেওয়া যেত না? টি-টোয়েন্টিতে ধারাবাহিক মন্থর ইনিংস খেলে সমালোচিত তাওহীদ হৃদয়ের জায়গায় সোহানকে ভাবার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি টিম ম্যানেজমেন্টের।
অবশ্য সোহানকে এমন পরিস্থিতিতে আগেও পড়তে হয়েছে। ২০১৬ এশিয়া কাপে বসে বসেই কেটেছে তাঁর। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও তাই। সোহানের নিয়মিত সুযোগ মিলেছে ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। তখনকার কোচ রাসেল ডমিঙ্গো যখন মুশফিকুর রহিমের কাছ থেকে উইকেটকিপিংয়ের গ্লাভস ‘কেড়ে’ নেন, সে নিয়ে হয় বিরাট হইচই। মুশফিক সংবাদমাধ্যমের কাছে রীতিমতো ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষে। ২০২২ এশিয়া কাপে সোহানের সুযোগ ছিল অধিনায়ক হিসেবেই খেলার। ক্যারিয়ারের সেরা সময়টা তাঁর কেটেছে তখনই। অথচ দুর্ভাগ্য, এশিয়া কাপের কদিন আগে জিম্বাবুয়ে সফরে পেলেন আঙুলে চোট। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মুশফিক ২০ ওভারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলে ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিয়মিত খেলার সুযোগ পেলেন সোহান।
ওই বিশ্বকাপের পর আবারও ছিটকে যান জাতীয় দল থেকে। ২০২১ ও ২০২২ সাল বাদ দিলে বাংলাদেশ দলে বসে বসে কাটানোর অভিজ্ঞতাই বেশি সোহানের। এই টুর্নামেন্টেও যে বসে কাটবে সোহানের, সেটা দল ঘোষণার সময়েই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বিসিবির প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। দুই নিয়মিত উইকেটকিপার ব্যাটার লিটন দাস আর জাকের আলীর বিকল্প হিসেবেই সোহানকে দলে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন লিপু। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটা এভাবে কারও ‘বিকল্প’ হতে হতেই যেন কেটে যাচ্ছে ৩১ বছর বয়সী উইকেটকিপার ব্যাটারের।
খেলায় ‘ভুল সময়ে জন্মের’ যে বিষয়টি আসে, সেটি মানতে বরাবরই নারাজ সোহান। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের অস্ট্রেলিয়া সফর ভালো করে সুযোগ পেয়েই সোহান আজকের পত্রিকাকে বলেছিলেন, ‘এটা জীবনের অংশ। আমরা সবাই তো খেলছি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য। কেউ ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য খেলছে না। বাংলাদেশ ক্রিকেট সবার আগে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।’
একাদশে জায়গা পেতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখেন সোহান। মানসিকভাবে শক্ত থাকার এটাই বোধ হয় সেরা উপায়!