রাজশাহীতে জনসভায় তারেক রহমান
রাজশাহীর নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন বানচালের জন্য আরেকটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। এখন জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। সবাই সতর্ক থাকলে ১৩ তারিখ থেকে শুরু হবে জনগণের দিন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে আয়োজিত এই জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘বিগত ১৬ বছর আমরা কয়েকটি তথাকথিত নির্বাচন দেখেছি। রাতের নির্বাচন দেখেছি, আমি-ডামি নির্বাচন দেখেছি, গায়েবি নির্বাচন দেখেছি। দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তারা চলে গেছে, যারা ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু আরেকটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। ভেতরে-ভেতরে ষড়যন্ত্র করছে কীভাবে এই নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, কীভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়।’
ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনার যত মানুষের সঙ্গে দেখা হবে; প্রত্যেককে বলবেন—আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন যেন কেউ বানচাল করতে না পারে সে জন্য সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। সকলকে সজাগ থাকতে হবে। জনগণ যদি ১২ তারিখে সতর্ক-সজাগ থাকে, ১৩ তারিখ থেকে শুরু হবে জনগণের দিন। ধানের শীষ বিজয়ী হলে ১৩ তারিখ থেকেই শুরু হবে জনগণের জয়যাত্রা।’
যেকোনো বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সঠিক তদন্ত করার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা ঝগড়া-ফ্যাসাদ-বিবাদে যেতে চাই না। যেতে চাই না বলেই আজ এখানে দাঁড়িয়ে আমি কারও সমালোচনা করছি না। কিন্তু কোথাও যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আছে তাদেরকে বলব—সঠিক সুষ্ঠু তদন্ত করুন। সেই তদন্তে যদি বিএনপির কোনো ভূমিকা থাকে, আমরা সহায়তা করব। কিন্তু সঠিক তদন্ত হতে হবে। সঠিক তদন্ত অনুযায়ী দেশের আইন অনুযায়ী বিচার হতে হবে যদি কোথাও কোনো সমস্যা হয়ে থাকে।’
গণতন্ত্রকে রক্ষা করার সময় এসেছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে পরিষ্কার কথা। আমরা দেশে শান্তি চাই। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সকলকে নিয়ে আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’ ’৭১ সালে যখন আমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, মুক্তিযোদ্ধারা যখন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; তখন আমরা দেখিনি কার কী ধর্ম। ২০২৪ সালে যখন দেশের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল স্বৈরাচারকে বিদায় করার জন্য, তখনো আমরা দেখিনি কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিষ্টান। কাজেই আজ দেশ গড়ার সময় এসেছে। আজ গণতন্ত্রকে রক্ষা করার সময় এসেছে। আজ আমরা ধর্ম দেখতে চাই না। আমরা দেখব সে মানুষ। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় সে বাংলাদেশি, তার সবচেয়ে বড় পরিচয় সে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, শান্তিতে বিশ্বাসী। আমরা তাদের সাথে আছি। আমরা তাদেরকে সাথেই রাখতে চাই।’
২২ বছর পর রাজশাহী আসার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘এখানে শিক্ষিত বহু মানুষ কর্মসংস্থানের অভাবে ঘরে বসে আছে। এখানে আইটি পার্ক করেছে। কিন্তু কোনো কাজ হয় না। এই বিষয়গুলোতে আমাদের নজর দিতে হবে। আমাদের নদীতে পানি দরকার। বরেন্দ্র প্রকল্প (বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ— বিএমডিএ প্রকল্প) শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চালু করেছিলেন। এরপরই তাঁর সময়ে দেশ খাদ্য দ্বিগুণ উৎপাদন করে। সেই বরেন্দ্র প্রকল্প আজ বন্ধ বন্ধ অবস্থা। এই বরেন্দ্র প্রকল্প দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সময় আরও বড় করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে বিশাল একটি প্রজেক্ট হয়েছিল। সেচের পাশাপাশি এর মাধ্যমে বনায়নের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। কিন্তু বিগত ১৬ বছর এটাতে কোনো কাজ নেই। সেই প্রকল্পকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। আমরা সেটাকে নিয়ে কাজ করব।’
‘আর একটি কাজ করতে চাই, যদি আপনাদের সমর্থন থাকে। আমরা পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের কাজে হাত দিতে চাই। পদ্মা ব্যারাজ যদি করতে পারি, পুরো এলাকার উপকার হবে। এ জন্য পুরো উত্তরাঞ্চলের প্রত্যেকটি মানুষকে ধানের শীষকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে হবে।’
বিএনপি এবার নির্বাচনে সরকার গঠন করলে রাজশাহী আইটি পার্ক সচল করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, ভকেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা, নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলা, নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড এবং কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। রাজশাহী অঞ্চলে কৃষিনির্ভর শিল্প-কারখানা গড়তে উদ্যোক্তাদের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
পাশাপাশি রাজশাহীতে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ইচ্ছার কথাও জানান তারেক রহমান। বলেন, ‘এখানকার বহু মানুষ চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে যায়। বৈদেশিক মুদ্রা তারা নিয়ে যাচ্ছে। আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন করতে চাই। এ জন্য রাজশাহীতে কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করতে পারি কি না, সেটি দেখব যাতে করে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা দেশেই রেখে দিতে পারি। এটা আমাদের দেশের উন্নয়নে কাজে লাগবে।’
মেগা দুর্নীতির উদ্দেশ্যে অতীতে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল অভিযোগ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বিগত ১৬-১৭ বছর এই দেশের ভোটের অধিকার যেমন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, ভোটের অধিকার যেমন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তেমনি; মেগা মেগা প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ছিল মেগা দুর্নীতি। এলাকার মানুষের জন্য রাস্তাঘাট নির্মাণ, এলাকার হাসপাতাল, শিক্ষক ঠিকমতো পাঠানো, ডাক্তার ঠিকমতো পাঠানো—এগুলো কোনো কাজ ঠিকমতো করা হয়নি। ৫ আগস্ট যে পরিবর্তন হয়েছে, সেই পরিবর্তন জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন যাতে করে সে জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। এ জন্য ১২ তারিখের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আগামীতে দেশকে কোন দিকে পরিচালিত করব। দেশকে গণতন্ত্রের দিকে পরিচালিত করব, নাকি অন্য কোনো দিকে চলে যাবে। যদি গণতন্ত্রের দিকে নিয়ে যেতে হয় তাহলে এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু গণতন্ত্রকে ধরে রাখতে না পারলে মেগা প্রজেক্ট হবে, জনগণের কোনো প্রজেক্ট হবে না। গণতন্ত্রের ভিত্তি যদি মজবুত হয়, তাহলেই জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক শাসন হবে।’
পরে তারেক রহমান রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ধানের শীষের ১৩ জন সংসদ সদস্য প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেন। সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাজ হলো আগামী ১২ তারিখ পর্যন্ত এদেরকে দেখে রাখা। ১৩ তারিখ থেকে এরা আপনাদেরকে দেখে রাখবে।’
জনসভায় রাজশাহী জেলা ও মহানগর এবং নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। এতে মাদ্রাসা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। বিকেলে নওগাঁর একটি জনসভায় অংশ নেবেন তারেক রহমান। এরপর রাতে বগুড়ায় নিজের নির্বাচনী এলাকার একটি জনসভায় তিনি বক্তব্য দেন।