রাজার ছেলে রাজা হবে—এই সংস্কৃতি বদলে দিতে দেশের ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘শুধু রাজার ছেলে রাজা হবে, রাজনীতির এই সংস্কৃতি আমরা পাল্টে দিতে চাই। যার যোগ্যতা আছে, সেই দেশ পরিচালনা করবে।’
বাগেরহাট খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার মোড়সংলগ্ন মাঠে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াতের আমির। এ দিন তিনি নির্বাচনী সমাবেশ শুরু করেন যশোর থেকে। এরপর একে একে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের জনসভায় বক্তব্য দেন তিনি।
বাগেরহাটের জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, ‘আপনাদেরকে সাবধান করে যাব, কেউ যদি আকাশ থেকে কালো চিলের রং ধারণ করে কারও ভোট ছোঁ মেরে নিতে চায়, ওর ডানাসহ তুলে ফেলবেন। আগের ১৫ বছর আমার ভোট আমি দিব, তোমারটাও আমি দিব, এটা অচল। আমার ভোট আমি দিব, তোমার ভোট তুমি দেও, আমার ভোটে হাত বাড়ালে খবর আছে।’
জামায়াতের বাগেরহাট জেলা শাখার আমির মাওলানা রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতা ও জেলার বিভিন্ন আসনে দল ও জোটের প্রার্থীরা।
গণভোট ইস্যুতে শফিকুর রহমান বলেন, ‘গণভোটে হ্যাঁ মানেই হচ্ছে ফ্যাসিবাদ আর ফিরে না আসুক, হ্যাঁ মানে আজাদি, ১২ তারিখের প্রথম ভোট হবে হ্যাঁর পক্ষে। হ্যাঁ জিতলে বাংলাদেশ জিতে যাবে। আমরা বাংলাদেশকে হেরে যেতে দিতে পারি না।’
সব শেষ বাগেরহাটের চারটি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে এবং তাঁদের জন্য দাড়িপাল্লা মার্কায় ভোট চেয়ে সমাবেশ শেষ করেন দলের আমির।
সাতক্ষীরাকে বিগত সরকার দেশের অংশ মনে করত না দুপুরে সাতক্ষীরা সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, জামায়াত-অধ্যুষিত জেলা হিসেবে সাতক্ষীরার জনগণ বিগত সরকারের আমলে বিমাতাসুলভ আচরণ পেয়েছে। এই জেলাকে বিগত সরকার এ দেশের অংশ বলেই মনে করত না।
ভারতের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের আমির বলেন, ‘সাতক্ষীরার ক্রিকেটার মোস্তাফিজকে নিয়ে ভারত যে অন্যায্য আচরণ করেছে, সেটা খুবই দুঃখজনক। প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমরা ন্যায্যতাভিত্তিক আচরণ প্রত্যাশা করব, কিন্তু কাউকে প্রভু হিসেবে আসতে দেওয়া হবে না।’
জামায়াতের আমির আরও বলেন, কেউ কেউ মায়েদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ তাঁদের গায়ে হাত তুলছেন, এটা কেমন দ্বিচারিতা!
জেলা জামায়াতের সভাপতি শহীদুল ইসলাম মুকুলের সভাপতিত্বে সমাবেশে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন আসনে দলের প্রার্থীরা বক্তব্য দেন।
সিন্ডিকেটমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলব
সকালে যশোর ঈদগাহ ময়দানে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘যারা নিজেদের দলকে সামলে রাখতে পারে না, কর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই দল যত বড় দলই হোক, তাদের কাছে বাংলাদেশ নিরাপদ নয়। আপনারা দেশ গড়ার আগে নিজের দলকে গড়েন ভালো করে। এতে দেশ লাভবান হবে; আপনারাও লাভবান হবেন।’
গণভোট নিয়ে বাহ্যিকভাবে যা-ই হোক, ভেতরে-ভেতরে একটি দল নাখোশ বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। জামায়াতের আমির বলেন, ‘এই গণভোট হলে ফ্যাসিবাদ কায়েম হবে না। গণভোট হলে কারও সম্পদের ওপর হাত দেওয়া যাবে না। এই গণভোট হলে দলীয় চাঁদাবাজির রমরমা ব্যবসা চলবে না। সেই জন্য কেউ কেউ গণভোটে সন্তুষ্ট না।’ এ বিষয়ে আমির আরও বলেন, ‘কিন্তু তারা মুখ খুলে বলতে পারছে না। কারণ, ১৮ কোটি মানুষ গণভোটের পক্ষে।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘সিন্ডিকেটমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলব। সিন্ডিকেট গোটা বাংলাদেশকে অবশ করে দিয়েছে। এই সিন্ডিকেটের হাত গুঁড়িয়ে দেব। চাঁদাবাজি করা লাগবে না; চাঁদাবাজদের বুকে টেনে নিয়ে তাঁদের হাতে কাজ দিয়ে দেব। যারা এসব চাঁদাবাজদের বিপথে নিয়েছে, তাদেরকেও সুপথে নিয়ে আসব। সুপথে এসে সবাই দল করুক।’
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন যশোর জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসুল। কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি দলের প্রার্থীরাও সমাবেশে বক্তব্য দেন।
পায়ে পাড়া দিয়ে আঘাত করলে সহ্য করব না
বিকেলে খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে খুলনা জেলা ও মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আয়োজিত ১১ দলের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘পায়ে পাড়া দিয়ে, মুখে বা শরীরে আঘাত করে কেউ যদি আশা করে আমরা চুপ করে থাকব—তা হবে না। আমরা ঝগড়া চাই না, কিন্তু সেই কালো হাত যদি সামনে বাড়ানোর চেষ্টা করেন, আমরা গালে হাত দিয়ে বসে থাকতে পারব না ভাই।’
খুলনার শিল্প পরিস্থিতি তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, একসময় খুলনাকে শিল্পের রাজধানী বলা হলেও গত ৫৪ বছরে শিল্প খাত বিকশিত হয়নি। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত অধিকাংশ শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের অন্য দেশগুলো শিল্পে এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশে একের পর এক শিল্প ধ্বংস করা হয়েছে।
এলাকার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আল্লাহ যদি আমাদের এই দেশের খেদমতের দায়িত্ব দেন, আমরা কথা দিচ্ছি, আপনাদের সঙ্গে বসে, আপনাদের সঙ্গে ডায়ালগ করে, কোন কাজটা আগে করলে এই এলাকার উন্নয়ন হবে, দেশের উন্নয়ন হবে, আমরা তা ঠিক করব। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আপনাদের সম্পদ আপনাদের হাতে তুলে দেব।’
কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা বেকার ভাতা নয়, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব। যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি দেওয়া হবে। মামা-খালু বা টেলিফোন তদবিরের কোনো সুযোগ থাকবে না। ধর্ম-বর্ণ নয়, যোগ্যতাই হবে একমাত্র বিবেচ্য।’
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও খুলনা মহানগর আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান খুলনার সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। জামায়াত ও শরিক বিভিন্ন দলের নেতা ও বিভিন্ন আসনের প্রার্থীরা সমাবেশে বক্তব্য দেন।