জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দলীয় প্রতীক ‘নৌকা’ প্রথমবারের মতো কয়েক দশক পর তাঁর নিজ জেলা গোপালগঞ্জের নির্বাচনী মাঠেই অনুপস্থিত। একসময় যে প্রতীকটি এই এলাকার ভোটের চিত্র নির্ধারণ করত, এবার তার কোনো চিহ্নই নেই।
তার বদলে গোপালগঞ্জের দেয়াল, খুঁটি আর মোড়ে মোড়ে ঝুলছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ব্যানার-পোস্টার। তারা ভোটারদের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাদের পক্ষে ভোট দিতে আহ্বান জানাচ্ছেন।
গোপালগঞ্জ জেলা দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের সবচেয়ে নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখান থেকেই উঠে এসেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছরের বেশি সময় দেশ শাসন করেছেন শেখ হাসিনা। এই সময়ে বিরোধী দলগুলো কখনো নির্বাচন বর্জন করেছে, আবার কখনো শীর্ষ নেতাদের ব্যাপক গ্রেপ্তারের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পাঁচ তারিখে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এরপর তিনি ভারতে চলে যান।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সহিংস কার্যকলাপের অভিযোগে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। আর এ কারণেই দলটি এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই নির্বাচন হচ্ছে। গত অক্টোবরে ই-মেইলে শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিলে কয়েক কোটি সমর্থক প্রার্থীহীন হয়ে পড়বে। এতে অনেকেই নির্বাচন বর্জনের পথে যাবে বলে তিনি মনে করেন।
গোপালগঞ্জে বিভিন্ন স্থানে লাগানো বিভিন্ন দলের পোস্টারের নিচে দাঁড়িয়ে রিকশাচালক এরশাদ শেখ বলেন, ‘ওরা যত খুশি পোস্টার লাগাক। ব্যালটে যদি নৌকা না থাকে, তাহলে আমার পরিবারের ১৩ জন ভোটারের কেউই ভোটকেন্দ্রে যাবে না।’
গত বছরের শেষ দিকে ঢাকার একটি আদালত ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান দমনে প্রাণঘাতী দমনপীড়নের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হন। তাঁদের বেশির ভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত বা নিহত হয়েছেন।
এই অবস্থায় বাস্তবতা হলো আওয়ামী লীগ ভোটারদের একাংশ এখন বিএনপি ও জামায়াতের দিকে ঝুঁকছেন। এ মাসে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, সাবেক আওয়ামী লীগ ভোটারদের প্রায় অর্ধেক এখন বিএনপিকে সমর্থন করছেন। জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে আছে। প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ঝুঁকছেন।
ঢাকাভিত্তিক কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের ওই জরিপে বলা হয়, সাবেক আওয়ামী লীগ ভোটাররা এলোমেলোভাবে বিভিন্ন দলে ছড়িয়ে পড়ছেন না। তাঁরা রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না; বরং নির্দিষ্ট কিছু বিরোধী দলের দিকে সমর্থন কেন্দ্রীভূত করছেন।
গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ কর্মীদের পরিবারগুলো বলছে, শেখ হাসিনার পরবর্তী সময়ে তাদের ব্যক্তিগত জীবনে বড় ক্ষতি হয়েছে। শিখা খানম নামের একজন জানান, তাঁর ভাই ইব্রাহিম হোসেন, বয়স ৩০, আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠনের একজন কর্মী। গত বছরের জুলাইয়ে এক সমাবেশ ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় তাঁকে ডিসেম্বর মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। খানম বলেন, তাঁর ভাইকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
এই ঘটনার পর তাঁদের পরিবার রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আর ভোট দেব না। আমাদের রাজনীতি শেষ।’
২০২৪ সালের অভ্যুত্থান স্মরণে ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ডাকে জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে সমাবেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ জানিয়েছেন, তাঁরা এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রেস্তোরাঁর কর্মচারী মোহাব্বত মোল্লা বলেন, প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও তাঁর কাছে কিছু বদলায়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী এখানে নেই। আওয়ামী লীগ এখানে নেই।’
তবে কেউ কেউ গোপালগঞ্জের দেয়ালে বদলে যাওয়া নির্বাচনী পোস্টার ও ব্যানারে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেখছেন। ব্যবসায়ী শেখ ইলিয়াস আহমেদ মনে করেন, আসন্ন এই নির্বাচন মানুষকে সত্যিকারের ভোট দেওয়ার সুযোগ দেবে। তিনি বলেন, ‘আগে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখতাম, আমার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এবার আমি বিশ্বাস করতে চাই, পরিস্থিতি বদলাবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহান বলেন, আওয়ামী লীগ ভোটাররা কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটাই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, ‘আমি সারা দেশে নির্বাচন বর্জন হবে বলে মনে করছি না। কট্টর সমর্থকেরা হয়তো ভোট দেবেন না। কিন্তু যাঁরা দ্বিধায় আছেন এবং স্থানীয় বিষয়কে গুরুত্ব দেন, তাঁরা ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন। তাঁরাই ফল নির্ধারণ করতে পারেন।’