মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ সময় জেলেরা যাতে জীবিকার সংকটে না পড়েন, সে জন্য সরকার প্রতি জেলেকে ২৫ কেজি করে বিনা মূল্যে চাল বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় পেরিয়ে গেলেও পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার রণগোপালদী ও দশমিনা ইউনিয়নের কোনো জেলেই চাল পাননি। ঘটনায় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। এখন জরুরি হলো জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল দেওয়া নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়ী জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
জেলেদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্যরা নিজেদের মধ্যে চালের ভাগবণ্টন, তালিকায় তাঁদের আত্মীয়স্বজন এবং জেলে নয়—এমন মানুষদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চাল দিতে দেরি করছেন। একদিকে সহায়তার চাল নিয়ে এ ধরনের গড়িমসি চলছে, অন্যদিকে পেটের দায়ে জেলেদের অনেকে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নিয়ে নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ইলিশ প্রজনন সুরক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। যে জনপ্রতিনিধিদের কাজ ছিল সংকটের দিনে হতদরিদ্র জেলেদের পাশে দাঁড়ানো, তাঁরাই উল্টো অসাধু উদ্দেশ্যে জেলেদের চাল দিতে বিলম্ব করছেন।
যেখানে নিষেধাজ্ঞার সময় আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেখানে এখনো কেন জেলেরা চাল পেলেন না, সেটার কৈফিয়ত তালাশ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের ভূমিকা নিতে হবে। আমাদের দেশে জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া সরকারি কোনো উদ্দেশ্য যে সফল হয় না, তার অনেক প্রমাণ দেওয়া যাবে। তালিকা সংশোধনের অজুহাতে সময় পার করার কৌশল কেন তাঁরা গ্রহণ করলেন, সেটারও কৈফিয়ত দিতে হবে। এরপরও যদি ইউপি চেয়ারম্যানরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাল বিতরণে ব্যর্থ হন, তবে উপজেলা প্রশাসনকে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে সরাসরি ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। চাল বিতরণে যাতে প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত না হন, সেটাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তালিকা কারচুপির মাধ্যমে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখতে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। এ তদন্তে যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসবে, তাঁকেই আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। সরকারি ত্রাণ নিয়ে অসদুপায় অবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা এখন সময়ের দাবি, যেন ভবিষ্যতে অন্য কোনো জনপ্রতিনিধি সাধারণ মানুষের হক নষ্ট করার সাহস না পান।
এ ধরনের অপরাধ নির্মূলের জন্য ডিজিটালাইজেশনের বিকল্প নেই। সে জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে নিবন্ধিত জেলেদের তালিকা উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার অন্তত এক সপ্তাহ আগেই তালিকা চূড়ান্ত করে যথা সময়ে বরাদ্দ চাল প্রকৃত জেলেদের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ইলিশ রক্ষা করা যেমন জাতীয় স্বার্থের বিষয়, তেমনি এই ইলিশ ধরে যাদের জীবন চলে, সেই জেলেদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।