সারা দেশে হামের আতঙ্ক বিরাজ করছে। হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হয়েছে আর মৃত্যুবরণ করেছে পাঁচ শতাধিক। এপ্রিলের শেষ দিকে বান্দরবানের থানচি উপজেলার রেমাক্রী ইউনিয়নেও হানা দিয়েছে এই সংক্রামক রোগ। হামের প্রাদুর্ভাবের পর এবার সেখানে হামলা করেছে ডায়রিয়ার জীবাণু। স্থানীয় ওষুধের দোকানগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে না পর্যাপ্ত স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ। এ যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা!
রেমাক্রী দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। স্বাভাবিকভাবেই উপজেলা সদর কিংবা শহরের সঙ্গে এই এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ভালো নয়। তাই অনেক পরিবারের জন্য তাদের হামে আক্রান্ত সন্তানদের একটু ভালো চিকিৎসা দিতে সদরে নিয়ে যাওয়া কঠিন। ফলে দুর্গম ওই পাহাড়ি অঞ্চলে মেডিকেল ক্যাম্প বসিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু ডায়রিয়া আক্রান্তদের জন্য যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটা থেকেও তো বের হওয়া জরুরি।
চিকিৎসা যেখানে জনগণের মৌলিক অধিকার, সেখানে ডায়রিয়ার মতো একটি রোগের জন্য স্যালাইন ও ওষুধের সংকট হবে—তা মেনে নেওয়াটা সহজ নয়। এ সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত রেমাক্রীর ৫০ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই স্কুলশিক্ষার্থী।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ জানিয়েছেন, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী দুর্গম লিটক্রে এলাকায় হামে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দিতে মেডিকেল টিম গেছে। এবং তিনি রেমাক্রীতে ডায়রিয়ার ওষুধ পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন বলে আশ্বাসও দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুর্গম এলাকায় যখন কোনো রোগের সংক্রমণ বেড়ে যায়, তখন মেডিকেল টিমের সংখ্যা কেন বাড়ানো হয় না?
এই তথ্য নতুন নয় যে এসব এলাকার মানুষ খাওয়া ও রান্নার কাজে ব্যবহার করার জন্য কুয়া, নদী, ঝিরি ইত্যাদি প্রাকৃতিক উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে থাকে। এ ধরনের প্রাকৃতিক উৎসের পানিতে খনিজ পদার্থের গুণাগুণ থাকলেও কিংবা দেখতে পরিষ্কার হলেও অনেক সময় তা পুরোপুরি বিশুদ্ধ হয় না, অন্য উৎস থেকে নানা রোগের জীবাণু তাতে মিশে থাকতে পারে। এ ছাড়া, উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগ এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে পাহাড়ি অঞ্চলে ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। প্রায়ই পাহাড়ে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। তখন বাধ্য হয়ে মানুষ ডোবা বা অপরিষ্কার কুয়ার পানি ব্যবহার করে। পানি ফুটিয়ে পান করার প্রয়োজনীয়তা এবং স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহারের অভ্যাস তাদের অনেকের মধ্যেই কম থাকে।
যেহেতু যাতায়াতের সমস্যার কারণে পাহাড়ি এলাকায় সহজে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছায় না এবং রোগ দেখা দিলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা বা ওষুধ পাওয়া সম্ভব হয় না, ফলে সাধারণ ডায়রিয়াও অনেক সময় মারাত্মক রূপ ধারণ করে। এ কথা দেশের নীতিনির্ধারকেরা কবে বুঝবেন? পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে সঠিক স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়াতে এবং তাদের সবার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে আর কত বছর পার করে দেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়?