সম্প্রতি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আবার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। চাল, ডাল, ডিম, সিলিন্ডার গ্যাস, তেল, মাছ ও মাংস থেকে শুরু করে সবজি পর্যন্ত—এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে। ইরানে আগ্রাসনের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন খরচ বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রতিটি কাঁচামালের ওপর। এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ছে। তবে দাম বাড়ার কারণে নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষের কাছে এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি এখন একটি মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
কিন্তু সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি ও তদারকির অভাবে যে অসৎ ব্যবসায়ীরা সুযোগ গ্রহণ করে মানুষকে বেকায়দায় ফেলছেন—সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার দোহাই দেওয়া হয়। তবে আমাদের দেশের বাজার অব্যবস্থাপনার অভ্যন্তরীণ কারণগুলো কোনো অংশে কম দায়ী নয়।
দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি সমাজের বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় আঘাত হানছে। দীর্ঘ হচ্ছে হাহাকার। যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। তাদের খাদ্যতালিকায় এখন প্রোটিন বা পুষ্টিকর খাবার বিলাসিতা মাত্র। অনেক পরিবার তিন বেলার বদলে দুই বেলা খেয়ে দিনাতিপাত করছে। অপুষ্টির ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে কোমলমতি শিশুরা।
মধ্যবিত্তের না-বলা কষ্টগুলো আরও করুণ। লোকলজ্জার ভয়ে তারা পারে না টিসিবির ট্রাকের পেছনের লাইনে দাঁড়াতে। ফলে বাধ্য হয়ে ঋণ করে এবং সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে। এভাবে জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দিয়েও তারা টেনেটুনে মাস শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছে। শুধু তিন বেলা খাওয়ার জন্য সন্তানদের শিক্ষা আর পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়ও কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
সাধারণ জনগণের এই দুর্দশা লাঘবে তাই সরকারের এগিয়ে আসা ছাড়া উপায় নেই। একমাত্র সরকারই তাদের একটু স্বস্তির জীবন দিতে পারে। সে জন্য সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে আমদানি পণ্যের শুল্ক কমিয়ে বাজারে স্বস্তি ফেরাতে হবে। একই সঙ্গে আসন্ন বাজেটে নতুন করে ভ্যাট বাড়ানো যাবে না এবং পণ্যের সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে হবে।
টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ শুধু শহর নয়, গ্রাম পর্যায়েও বিস্তৃত করতে হবে। মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের বীজ, সার ও সেচকাজে বড় ধরনের ভর্তুকি দিতে হবে। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বৃদ্ধি করে বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক করতে হলে সরকারকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় দিতে হবে। বাজার যেন অসাধু ব্যবসায়ীদের কবজায় না থাকে এবং সাধারণ মানুষ যেন একটু স্বস্তিতে দুই বেলা ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতে পারে—সেটা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। অন্যথায় সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বৃহত্তর অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।