মুদ্রণযন্ত্রের কোনো ভুল নয়। শিরোনামটি ‘নির্যাতন’ই লেখা হয়েছে। পাঠক হয়তো ভাবছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যত ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোই বুঝি এ মুহূর্তে বেশি গুরুত্ব বহন করে।
কিন্তু নির্বাচনের ডামাডোলের ভিড়ে নির্যাতনের একটি খবর চাপা না পড়ে বরং জনগণের বিবেক নাড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাফিকুর রহমানের বাসায় থাকা শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এবার আঁতকে উঠতে হচ্ছে শিশুটির মুখে নির্যাতনের বর্বর বর্ণনা শুনে!
৯ ফেব্রুয়ারি আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে শিশুটির জবানবন্দি থেকে পাওয়া তথ্য। ওই শিশু গৃহকর্মী জানায়, মসলা বাটার নোড়া দিয়ে তার হাত-পা ও পিঠে আঘাত করা, চুল টেনে তুলে ফেলা এবং খুন্তি গরম করে তা দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। তার অভিযোগ, সংসারের কোনো ক্ষতি না করলেও তাকে মারধর করা হতো। সাফিকুর রহমানের স্ত্রী বীথিই তাকে বেশি মারতেন। এমনকি ওই বাসার অন্য গৃহকর্মীরাসহ সবাই মারধর করতেন।
২ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৩টার দিকে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ। এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বীথি এবং ওই বাসার অন্য দুজন গৃহকর্মী রূপালী খাতুন ও মোছা. সুফিয়া বেগমকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। নির্যাতনের এই ঘটনায় সাফিকুর রহমানকে বিমানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় সরকার।
বিয়েসহ যাবতীয় খরচ বহন করার প্রলোভনে ১১ বছর বয়সী শিশুটিকে গৃহকর্মী হিসেবে রেখে এসেছিলেন হোটেল কর্মচারী বাবা। কিন্তু ৩১ জানুয়ারি মেয়ের অসুস্থতার খবর জেনে তাকে আনতে গেলে বাবা দেখেন, তাঁর সন্তানের দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম। কথাও বলতে পারছিল না শিশুটি। এমন অবস্থায় একজন বাবার মানসিক অবস্থা কী হতে পারে, তা নিশ্চয় ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।
মেয়ের কাছে নৃশংস অত্যাচারের কথা শুনে তার বাবা থানায় মামলা করেন। পুরো দেশ এখন অপেক্ষা করছে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার। এ ছাড়া আইন অনুযায়ী তাদের এমন শাস্তি হওয়া উচিত, যেন আর কেউ শিশু গৃহকর্মী কিংবা অন্য গৃহকর্মীদের নির্যাতনের কথা ভুলেও ভাবতে না পারে। নিশ্চয় আমরা সবাই বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখি।
তবে সরকারিভাবে শিশুশ্রম এবং নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের জোর প্রচার চালাতে হবে। ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করানো নিষিদ্ধ এবং ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ বেআইনি, এমন কথা জানতে হবে সবাইকে। যারা শিশু নির্যাতন করে, তাদেরও জানতে হবে—দহনকারী পদার্থ বা অন্য কোনোভাবে অঙ্গহানি কিংবা শরীরের অঙ্গ বিকৃত করলে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
দরিদ্র বাবা-মায়েদের বাধ্য হয়েই প্রায় সময় তাঁদের শিশুসন্তানদের কাজে পাঠাতে হয়। এই চেনা সমস্যার সমাধান নিশ্চয় নীতিনির্ধারকদের কাছে আছে। তা প্রয়োগের অপেক্ষা আর কত যুগ করতে হবে—শুধু এই প্রশ্নের উত্তর অজানা।