হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সংস্কৃতি আত্মপরিচয়ের ভিত্তি

মাসুমা হক

প্রতীকী ছবি

সংস্কৃতি বলতে আমরা অনেকেই কেবল গান, নাটক, নৃত্য কিংবা বিনোদনের বিভিন্ন মাধ্যমকে বুঝে থাকি। অথচ সংস্কৃতির পরিধি এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত, গভীর ও সুদূরপ্রসারী। একটি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, ভাষা, বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, সামাজিক আচরণ, রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি—এমনকি ধর্মীয় অনুশীলনও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা অনেক সময় সংস্কৃতি ও বিনোদনকে অভিন্ন মনে করি এবং সংস্কৃতির প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবনে ব্যর্থ হই। অথচ সংস্কৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন শিল্পচর্চা নয়; এটি একটি জাতির সামগ্রিক অস্তিত্ব, আত্মপরিচয় ও ঐতিহাসিক স্মৃতির ধারক।

নৃতত্ত্ববিদ এডওয়ার্ড বার্নেট টাইলর সংস্কৃতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘সংস্কৃতি হলো সেই জটিল সামগ্রিক চেতনা, যার মধ্যে রয়েছে জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্প, আইন, নৈতিকতা, প্রথা এবং সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষের অর্জিত সামগ্রিক ক্ষমতা ও অভ্যাস।’ তাঁর এই সংজ্ঞামতে সংস্কৃতি কেবল উৎসবমুখর আয়োজনের নাম নয়; বরং এটি মানুষের চেতনা, অভ্যাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনদর্শনের সম্মিলিত রূপ। একটি জাতির সংস্কৃতি মূলত সেই জাতির আত্মার প্রতিচ্ছবি।

বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। হাজার বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এটি গড়ে উঠেছে। প্রাচীন বাংলায় আর্য সংস্কৃতির সঙ্গে স্থানীয় দ্রাবিড় ও অস্ট্রিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণে যে নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করে। এরপর পাল শাসনামলে বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে শিক্ষা, সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পকলার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। সহজিয়া মতবাদ, শাক্তধারা ও তান্ত্রিক সংস্কৃতির পারস্পরিক আদান-প্রদান বাংলা সংস্কৃতিকে আরও বহুমাত্রিক ও গভীর করে তোলে। অর্থাৎ বাংলা সংস্কৃতি কোনো একক ধারার নয়; এটি বহু স্রোতের সম্মিলিত এক জীবনধারা।

বাংলার ইতিহাসে মুসলিম শাসনও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরু থেকে প্রায় সাড়ে ৫০০ বছর বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, স্থাপত্য ও সংগীতে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ছিলেন বাংলার মুসলিম যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি জাতিগতভাবে বাঙালি ছিলেন না; তথাপি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা তাঁকে বাঙালির ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। এমনকি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর আমলকে বাংলার নবজাগরণের সময় হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এখানেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত রয়েছে যে শাসক জনগণের সংস্কৃতিকে সম্মান করে, জনগণও তাঁকে আপন করে নেয়।

বিপরীতে যারা নিজেদের সংস্কৃতি জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চেয়েছে, তারা ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। কারণ সংস্কৃতি কখনো বলপ্রয়োগে পরিবর্তন করা যায় না। সংস্কৃতি মানুষের আত্মিক পরিচয়, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়ে সাময়িকভাবে কোনো কিছুকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব হলেও মানুষের হৃদয় থেকে তার সংস্কৃতিকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই সাংস্কৃতিক প্রশ্নটিই একসময় রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় ঐক্যের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অবজ্ঞা করেছিল। ভাষা, সংগীত, সাহিত্য, আচার-অনুষ্ঠান ও জীবনধারার প্রতি তাদের অবজ্ঞা বাঙালির মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। ধর্ম এক হলেও সংস্কৃতিগত বৈপরীত্য যে রাষ্ট্রীয় বিভাজনের কারণ হতে পারে, পাকিস্তানের ইতিহাস তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ সব সংগ্রামের ভেতরেই বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।

বাঙালি মুসলমানদের অধিকাংশই তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীর আত্মিক সম্পর্কে আবদ্ধ ছিল এবং এখনো আছে। কারণ, ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের অংশ হলেও সংস্কৃতি মানুষের শিকড়। ইসলাম এ ভূখণ্ডে এসেছে

প্রায় এক হাজার বছর আগে, কিন্তু বাংলা সংস্কৃতির উৎপত্তি তারও বহু পূর্বে। ফলে ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে মানুষ মুসলমান হলেও তাদের ভাষা, লোকাচার, উৎসব, আবেগ ও জীবনদর্শনের ভেতর বাঙালিত্ব অটুট থেকেছে।

এই ভূখণ্ডে ইসলামি সংস্কৃতি ও বাংলা লোকজ ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে যে সাংস্কৃতিক বিন্যাস গড়ে উঠেছে, তা পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম সমাজ থেকেও অনেকাংশে স্বতন্ত্র। গ্রামীণ পালাগান, বাউলধারা, পিঠা-পুলি, নববর্ষ, বিয়ের আচার কিংবা লোকসংগীত সবকিছুর মধ্যে এই মিশ্র ঐতিহ্যের প্রতিফলন দেখা যায়। এই সংস্কৃতি কোনো কৃত্রিম নির্মাণ নয়; এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক প্রবাহ।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু অভিজাত গোষ্ঠী আজও সাধারণ মানুষের এই সংস্কৃতিকে অবজ্ঞার চোখে দেখে। সময়ে-অসময়ে তথাকথিত ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের’ নামে নতুন সাংস্কৃতিক ধারা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আরোপিত বিদেশি শব্দ, কৃত্রিম জীবনধারা কিংবা আমদানি করা সাংস্কৃতিক উপাদান দিয়ে সাধারণ মানুষের বহু দিনের জীবনবোধকে প্রতিস্থাপন করার অপচেষ্টা করা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো সংস্কৃতি কোনো প্রকল্প নয়, এটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জীবনপ্রবাহ। জনগণের অনুভূতি ও ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে তৈরি করা সাংস্কৃতিক বয়ান কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

বাংলাদেশের মানুষ তাদের ইতিহাস, কৃষ্টি ও সভ্যতা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে হয়তো সাময়িকভাবে কিছু পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু জনগণের হৃদয় থেকে তাদের সংস্কৃতিকে মুছে ফেলা যায় না। বাঙালির সংস্কৃতি বহু আঘাত, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও টিকে থাকবে।

কারণ, এই সংস্কৃতি কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়; এটি এ জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি।

যে জাতি তার সংস্কৃতিকে ধারণ

করতে পারে না, সে জাতি ধীরে ধীরে

নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলে। রাজনৈতিক মতাদর্শের পরিবর্তন হতে পারে, রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল ঘটতে পারে, কিন্তু বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক শিকড়কে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। জনগণের হৃদয়ে স্থান না পাওয়া কোনো সাংস্কৃতিক প্রকল্প কিংবা রাজনৈতিক বয়ান শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের অতলেই হারিয়ে যায়।

বিড়ম্বনাময় এবারের ঈদযাত্রা

উষ্ণ পৃথিবীর শীতল সতর্কতা

মবের শাসন, মানুষের ভয়, রাষ্ট্রের নীরবতা

শিশুর নিরাপত্তায় সরকারের অবস্থান কী

যুদ্ধ বন্ধ করতে ইউরোপ কি এগিয়ে আসবে

স্বাধীনতাসংগ্রামের একজন কিংবদন্তি

সমীকরণ বদলাবে কি আঞ্চলিক সম্পর্কের

বাংলাদেশের অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ

অভ্যন্তরীণ উপাচার্য নিয়োগ কেন দরকার

একজন প্রকৃত মানুষ