হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

হরমুজ প্রণালি সংকট: খাদ্যনিরাপত্তা ও উৎপাদনে বহুমাত্রিক ঝুঁকি

অঞ্জন মজুমদার

প্রতীকী ছবি

হরমুজ প্রণালি ঘিরে বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এখন শুধু জ্বালানি সংকটেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে একটি সম্ভাব্য বৈশ্বিক খাদ্যসংকটে রূপ নিচ্ছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল, গ্যাস এবং সার পরিবাহিত হয়। ফলে এর ব্যাঘাত সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানি ও সারের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন ও মূল্যব্যবস্থা নতুন করে চাপে পড়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে হরমুজ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি ‘বৈশ্বিক কৃষি-খাদ্য বিপর্যয়’-এ রূপ নিতে পারে; বিশেষ করে সার ও জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদন কমে যাবে, ফসলের ফলন হ্রাস পাবে এবং খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাবে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তার অবস্থা ইতিমধ্যেই নাজুক হয়ে পড়েছে। এফএও, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৩০০ মিলিয়নের কাছাকাছি মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে এবং এ বছর এই সংখ্যা আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েক শ মিলিয়ন মানুষ মাঝারি খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করছে, যা বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তোলে।

বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকটের এমন প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে ‘গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি’ ধারণাটি ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে; বিশেষত বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখা ও খাদ্যনিরাপত্তার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে। গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি এমন একটি উৎপাদন ও ভোগব্যবস্থা, যেখানে অপচয় কমিয়ে সম্পদের পুনর্ব্যবহার, পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মাধ্যমে টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা হয়। কৃষি খাতে এই ধারণা প্রয়োগ করলে জৈব বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন, কৃষি অবশিষ্টাংশ থেকে বায়োগ্যাস তৈরি, পানি ও পুষ্টি পুনর্ব্যবহার এবং মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন সম্ভব হয়। আমদানিনির্ভর রাসায়নিক সারের ওপর চাপ কমে, উৎপাদন খরচ হ্রাস পায় এবং দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্য উৎপাদন স্থিতিশীলভাবে বৃদ্ধি পায় ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়, একই সঙ্গে এটি জলবায়ু সহনশীল কৃষি গড়ে তুলতে সহায়তা করে, যা বৈশ্বিক সংকটের সময় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষভাবে স্পর্শকাতর; দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও আমদানিকৃত জ্বালানির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে প্রভাবিত করে, অন্যদিকে কৃষি খাতেও সার ও জ্বালানির ওপর নির্ভরতা থাকায় খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের করণীয় হতে হবে সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগত; জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ অত্যন্ত জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

সরকারের একটি কার্যকর কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে বৈশ্বিক সংকটের সময় অন্তত স্বল্প মেয়াদে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়। কৃষি খাতে স্বনির্ভরতা জোরদার করতে হবে; দেশীয় সার উৎপাদন বৃদ্ধি, জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় খাদ্য মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকৃত জ্বালানি ব্যবস্থা, যেমন সৌরভিত্তিক মাইক্রোগ্রিড প্রসারিত করলে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর জ্বালানি সংকটের প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

হরমুজ প্রণালির সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্যব্যবস্থা কতটা পরস্পর নির্ভরশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সর্বশেষ সতর্কবার্তা স্পষ্ট—বিশ্ব একটি জটিল জ্বালানি-খাদ্যসংকটের দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের জন্যও যা গুরুত্বপূর্ণ। এখনই যদি গ্রিন সার্কুলার ইকোনমিভিত্তিক টেকসই কৃষি ও জ্বালানিব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া যায়, তবে এই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।

ট্রাম্প কি আবার ইরানে সংঘাতে জড়াবেন

থালাপতির উত্থানের নেপথ্য: ভারতের স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব

মুগ্ধকারিণীর নৃত্য

বিচ্ছিন্নতা পশ্চাৎপদতাও বটে

লালমনিরহাট বিমানবন্দর: আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনাময় কেন্দ্র

ট্রাম্প-সি বৈঠকে বিশ্ববাসী নতুন কিছু পাবে কি

নিজেদের মেধাকে আগে কাজে লাগান

আমাদের নার্স, আমাদের ভরসা

আত্মবিনাশী উন্নয়নে হাওরের সর্বনাশ

মমতা কি সম্ভাবনা নাকি বিপদে রেখে গেলেন