আসন্ন বাজেটের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের কথা জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য এটা যে অপরিহার্য, সে ব্যাপারে অনেকেই কথা বলছেন। ‘গণতন্ত্র’ ধারণাটিকে আমরা সাধারণত রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সঙ্গেই সমার্থক মনে করি। কিন্তু রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সীমানা পেরিয়ে গণতন্ত্রের নানাবিধ মাত্রিকতা আছে। যেমন অর্থনৈতিক গণতন্ত্র, সামাজিক গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক গণতন্ত্র ইত্যাদি। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে যে এটি গণতন্ত্রের অন্যান্য মাত্রিকতাকেও প্রভাবিত করে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিটি মানুষের জন্য সামষ্টিক সক্রিয়তার ক্ষেত্রটিকে সমান করে দেয়। এর জন্য প্রয়োজন সব ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষের জন্য সমান সুযোগ।
সুতরাং এটা পরিষ্কার যে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি অর্থনৈতিক সমতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। সে জন্য প্রয়োজন সর্বক্ষেত্রে সমান সুযোগের। সেই সুযোগ গ্রহণের জন্য প্রতিটি মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক সামাজিক সেবাগুলোতে সবার সমান প্রবেশাধিকার। কিন্তু সামাজিক সেবাগুলোতে অধিকারকে শুধু পরিমাণগত দিক থেকে দেখলে চলবে না, তাকে নিশ্চিত করতে হবে গুণগত দিক দিয়ে। মানসম্পন্ন শিক্ষা, সুব্যবস্থামূলক স্বাস্থ্য সবার কাছে লভ্য করে দিতে হবে। সক্ষমতা গঠিত হলে পরে ভূমি, ঋণ, আর্থিক সম্পদ, কর্মনিয়োজন সুযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি সুযোগের মতো উৎপাদনকেন্দ্রিক উপকরণে প্রতিটি নাগরিকের সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বনাঞ্চল, জলাশয় এবং অন্যান্য পরিবেশভিত্তিক যেসব যৌথ সম্পদ রয়েছে, সেখানেও সমাজের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার থাকা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের জন্য জনগণের কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা এবং সুশাসন সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। যেসব সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনের ওপরে প্রভাব ফেলে, সেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ অবশ্যই থাকতে হবে। এবং সেসব অংশগ্রহণ লোকদেখানো হলে চলবে না, সেগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ হতে হবে। অনেক সময়েই এ-জাতীয় প্রক্রিয়ায় দরিদ্র এবং প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ প্রতীকী পর্যায়েই থেকে যায় এবং সেখানে তাদের কণ্ঠস্বর অনুপস্থিত থাকে। আলোচনা প্রক্রিয়ায় তাদের সমপ্রতিনিধিত্ব ভিন্ন সমাজের সাধারণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় না। অর্থনৈতিক বিতর্ক, আলোচনা এবং কথাবার্তায় এবং সেই সঙ্গে নীতিবিষয়ক সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব এবং অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়, যা ভিন্ন অর্থনৈতিক গণতন্ত্র বজায়ক্ষম হয় না।
তৃতীয়ত, দেশের সব নাগরিকের জন্য সুবিধার সমতার নিশ্চিতকরণও অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের একটি অত্যাবশ্যকীয় মাত্রিকতা। যদি সক্ষমতা এবং সুযোগের ক্ষেত্রে সম-অধিকার নিশ্চিত করা হয়; সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমপ্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়; তাহলে একটি দেশের প্রতিটি গোষ্ঠীই সমভাবে লাভবান হবে। এ সত্ত্বেও একটি সমাজে বৃদ্ধগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মতো নানান গোষ্ঠী থাকবে, যাদের কল্যাণের জন্য সুনির্দিষ্ট, লক্ষ্যমুখী নানান ব্যবস্থা থাকতে হবে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে থাকবে সামাজিক সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো নানান ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রকে সর্বজনীন মানবাধিকার এবং মানব নিরাপত্তাকেও তার কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। ধর্মীয় বিশ্বাস, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং আত্মপরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও আইনের বলয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে। সেই সঙ্গে তাদের প্রত্যেকের নিরাপত্তা বিধান রাষ্ট্রের কর্তব্য।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের চালচিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে, এ দেশের বিভিন্ন বলয়ে—যেমন আঞ্চলিক দিক থেকে, কিংবা নানান আর্থসামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে, গ্রাম ও নগরের মধ্যে এবং নারী সুগভীর অসমতা ও বৈষম্য বিদ্যমান। সেই সঙ্গে বলা দরকার যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দারিদ্র্য এবং অসমতা দুটোই বেড়েছে। যেমন এ দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর অনুপাত ১৮ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশ বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে অসমতা ও বৈষম্য—সুযোগের এবং ফলাফলেরও। আমাদের অর্জনের সুফল সমভাবে বণ্টিত হয়নি—না অঞ্চলের মধ্যে, না গ্রাম-শহরের মধ্যে, না বিভিন্ন আর্থসামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে। যেমন বাংলাদেশের উচ্চতম ১০ শতাংশের হাতে দেশের মোট ৫৮ শতাংশ সম্পদ রয়েছে, যেখানে দেশের নিচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষ (দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক) মাত্র ৪ শতাংশ ভোগ করে। তেমনিভাবে, দেশের নিচের দিকের ৪০ শতাংশ মানুষ জাতীয় আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ লাভ করে, যেখানে উচ্চতম ১০ শতাংশ পেয়ে যায় জাতীয় আয়ের ৩৮ শতাংশ।
একই রকম ভিন্নতা আছে মানব উন্নয়নেও। যেমন অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের শিশুমৃত্যুর হার দেশের উচ্চতম আয়ের পরিবারে যেখানে হাজারে ২০, সেখানে নিম্নতম আয়ের পরিবারে সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটি হচ্ছে ৫০। আঞ্চলিক প্রেক্ষিত থেকে, বরিশালে বয়স্ক সাক্ষরতার হার যেখানে ৭৫ শতাংশ, সিলেটে তা ৬০ শতাংশ মাত্র। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বৈষম্য বেশ গভীর। শিক্ষার বলয়ে একটি ত্রি-ধারার শিক্ষাকাঠামো—সাধারণ জনগণের জন্য সুবিধারহিত সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা, ধনিক শ্রেণির জন্য উচ্চ সুবিধাসম্পন্ন বেসরকারি শিক্ষাকাঠামো এবং ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা—অনুসরণ করার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির বিভাজিত চাহিদা মেটানো হয়। যেহেতু বিভিন্ন শ্রেণিস্তরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, সুতরাং এই বিভাজিত শিক্ষাকাঠামো সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তোলে। তেমনিভাবে স্বাস্থ্যসেবার খাতেও একটি ত্রি-ধারা কাঠামোর কারণে বাংলাদেশে একটি বৈষম্যমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী নিম্নমানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সুবিধা এবং সেবা পাচ্ছে এবং উচ্চমানসম্পন্ন সেবাগুলো লভ্য হচ্ছে উচ্চবিত্তের মানুষগুলোর কাছে। তথ্যপ্রযুক্তি সেবার ক্ষেত্রে উচ্চতম ২০ শতাংশ গৃহস্থালিতে তিন-চতুর্থাংশ গৃহের তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধায় লভ্যতা আছে, কিন্তু নিম্নতম ২০ শতাংশ গৃহস্থালির জন্য সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটি হচ্ছে ৯ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৩ শতাংশ বাড়িতে কম্পিউটার আছে এবং গ্রামের ৭৮ শতাংশ মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করতে জানে না।
সুযোগ এবং ফলাফলের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য বাংলাদেশে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের পথে একটি বিরাট বাধা। এ দেশে মাত্র ৩৬ শতাংশ নারী শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করে থাকে, যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণের হার ৮১ শতাংশ। এবং মধ্যস্তরের ব্যবস্থাপনায় নারীদের অনুপাত মাত্র ১২ শতাংশ। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ হচ্ছে মাত্র ১৭ শতাংশ, যেখানে পুরুষের সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটি হচ্ছে ৩৩ শতাংশ। নারীর প্রতি বৈষম্য এবং তার বিরুদ্ধে সহিংসতা বাংলাদেশি সমাজের অসমতার একটি অন্যতম বাস্তবতা। সুযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা বৈষম্যের শিকার হয়, যা প্রতিফলিত হয় ফলাফলে। ঘরে-বাইরে নানাবিধ হয়রানি আর সহিংসতার শিকার হয় নারীরা। সেসব নির্যাতনের অংশ হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, গৃহাভ্যন্তরের সহিংসতা এবং ধর্ষণ।
অসমতা বা বৈষম্য তো শুধু ফলাফলে নয়, তা পরিস্ফুট সুযোগেও। দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সুবিধাবঞ্চিত। তারা বঞ্চিত সম্পদে, ঋণ সুবিধায়, তথ্যপ্রযুক্তি সেবায়। ফলে কর্মনিয়োজন এবং আয়ের দিক থেকেও তারা বঞ্চনার শিকার হয়। রাজনৈতিক দিক থেকে বঞ্চিত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব জাতীয় পর্যায়ের নানান দিকে নিতান্ত সীমিত। সমাজ অঙ্গনে ধর্মীয় বৈষম্যের কথা বারবার নানান আলোচনায় উঠে এসেছে।
কিন্তু এতৎসত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এই গণতন্ত্রায়ণের জন্য কতগুলো মৌলিক ব্যবস্থা অত্যাবশ্যক। সব মানববঞ্চনাকে বিবেচনার মধ্যে এনে অর্থনৈতিক নীতিমালাকে সাম্যভিত্তিক করতে হবে। এসব নীতিমালাকে দরিদ্র এবং বঞ্চিত মানুষমুখী করা প্রয়োজন। সুতরাং অর্থনৈতিক গণতন্ত্রকে মাথায় রেখে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিমালা কাঠামো তৈরি করতে হবে। এই কাঠামোর মধ্যে শিক্ষা সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় জলের লভ্যতার মতো মৌলিক সামাজিক সেবাসমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। দরিদ্রবান্ধব আর্থিক নীতি, কর ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাজস্ব নীতি এবং সেই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোকে প্রণোদনা দেওয়ার মাধ্যমে উৎপাদন সম্পদের বলয়টিকে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রমুখী করা সম্ভব। এককথায়, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি কৌশল বাংলাদেশ অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণে অবদান রাখতে পারে।
জনগোষ্ঠীর যে অংশ দুর্বল এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে না, তাঁদের জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
দেশের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে বৈষম্যনিরোধী ও সাম্যবান্ধব হতে হবে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের মূল্যবোধকে ধারণ করতে হবে। এইসব মূল্যবোধের মধ্যে থাকবে দৃশ্যমানতা এবং দায়বদ্ধতার একটি জোরালো কাঠামো। এ কাঠামোর একটি বিশেষ মাত্রিকতা হবে একটি দৃঢ় নিরীক্ষণ ও মূল্যায়নব্যবস্থা, যার জন্য প্রয়োজন হবে একটি শক্তিমান বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যানকাঠামো। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রভিত্তিক করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার লাগবে। এই সংস্কারের একটি দিক হবে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপরে বিশ্বাসযোগ্য জোরালো বিভাজিত উপাত্ত।
শেষ কথা হচ্ছে যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর বিনিয়ন্ত্রণ করেই অর্থনৈতিক গণতন্ত্র নিশ্চিত করা যাবে না। সেটা অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত হতে পারে, কিন্তু পর্যাপ্ত শর্ত নয়। সেই সঙ্গে সম্পদে, সুযোগে সব মানুষের সমপ্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সেটাই হবে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণের পর্যাপ্ত শর্ত।