হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

লোহা দিয়ে লোহা কাটার অব্যর্থ কৌশল

আজাদুর রহমান চন্দন

লোহিতসাগরে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে হুতিরা টার্গেট করতে পারে। ছবি: এএফপি

লোহিতসাগর দিয়ে জ্বালানি রপ্তানি করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ নিয়ে বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব। গত ৩০ জুলাই সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। নতুন এই জোটের লক্ষ্য লোহিতসাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি ও এডেন উপসাগর দিয়ে সব ধরনের জাহাজের স্বাধীনভাবে চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আরব নিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জোট গঠন নিয়ে আলোচনার জন্য ৫১টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অংশ নেয় ৪৩টি দেশ। এর মধ্যে সৌদি আরবসহ ১৪টি দেশ নিয়ে জোট গঠন করা হয়েছে। পাকিস্তান ও তুরস্কের পাশাপাশি আছে বাংলাদেশের নামও। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান এই জোটে নেই। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই জোটে বাংলাদেশের জড়ানোর সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

এই জোটে যুক্ত হওয়ার পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য খুবই বিপজ্জনক। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যোগ দেওয়ার চেয়ে কম বিপজ্জনক তো নয়ই। দেশের স্বার্থের দিক দিয়েও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ এটি। কারণ যে অঞ্চলে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই জোট গড়া হয়েছে, সেই অঞ্চলে ইয়েমেনের হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের বিরোধ চলছে। ইরান-সমর্থিত হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি জাহাজের চলাচলের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। লোহিতসাগরে সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলাও চালিয়েছে হুতিরা। এখন সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার কারণে এই পথে চলাচলকারী বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো হুতিদের সরাসরি টার্গেটে পরিণত হতে পারে।

বাব আল-মানদেব প্রণালির এক পাশে ইয়েমেন। দেশটির উপকূলের বড় অংশ হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। সে কারণেই এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারছে গোষ্ঠীটি। প্রণালির অপর পাশে আছে ইরিত্রিয়া ও জিবুতি। এখন জিবুতি নতুন জোটের সদস্য হওয়ায় কিছুটা সুবিধা পেতে পারে সৌদি আরব। যদিও জোটের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই জোট মূলত প্রতিরক্ষা জোট হিসেবে কাজ করবে, তারা কোনো দেশকে নিশানা করবে না। এমন অস্থির পরিস্থিতিতে বাব আল-মানদেব প্রণালি, লোহিতসাগর এবং এডেন উপসাগরে নৌচলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় গঠিত নৌ সামরিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের তাৎপর্য এবং সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। এ ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার বিষয়টিকে সবচেয়ে বড় করে দেখা হচ্ছে। কেননা, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং ইরানের কট্টর প্রতিপক্ষ। এই জোট কার্যত সৌদি-মার্কিন ব্লকেরই অংশ। তাই ইরান এটিকে কীভাবে দেখবে, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। এ ছাড়া এটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন না হওয়ায় সক্রিয় সংঘাতপূর্ণ এই এলাকায় ইরান বা হুতিরা সৌদি নেতৃত্বাধীন যেকোনো জোটকে টার্গেট করতে পারে।

বাংলাদেশ অতীতে কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়নি। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বরাবরই নিরপেক্ষতা ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখে আসছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ৪২টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইসলামি সামরিক জোটে (আইএমসিটিসি) বাংলাদেশ যোগ দিলেও রিয়াদে জোটের সদর দপ্তরে পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিদল পাঠায়নি ঢাকা। এবার নতুন প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়ে কোনো সংঘাতে যাতে বাংলাদেশ না জড়ায়, সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকা আবশ্যক। এমনিতেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে গেছে। এই যুদ্ধে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের সহানুভূতি পাচ্ছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের মাখামাখিকে এ দেশের মানুষ মোটেই সুনজরে দেখে না। দেশের সিংহভাগ মানুষের পছন্দের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে কি সরকার খুব ভালো কাজ করল?

সৌদি নেতৃত্বাধীন এই জোট গড়ার খবর নিয়ে আলোচনার মধ্যেই বাংলাদেশ সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। তিন দিনের সফর শেষে শনিবার বাংলাদেশ ছাড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বিশেষ দূত। শেষ দিন তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এর আগের দিন তিনি কক্সবাজারের উখিয়ায় পরিদর্শন করেন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। তিনি আশ্রয়শিবিরের বিভিন্ন মানবিক ও সেবামূলক কার্যক্রম পরিদর্শন করার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের বর্তমান পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন। এ সবই হলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর। তবে সচেতন মানুষের জানতে বাকি নেই যে সার্জিও গরদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাধারণত সেখানেই পাঠিয়ে থাকেন ট্রাম্প, যেখানে কোনো বিষয়ে তাঁদের দ্রুত বড় কিছু করার থাকে। বাংলাদেশেও কি কোনো ইস্যুতে দ্রুত বড় কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র? বাংলাদেশকে ঘিরে মিয়ানমারে কিছু ঘটানোর মার্কিন ছক নিয়ে নানা কথাবার্তা আছে আগে থেকেই। সেই ছকের বাস্তবায়ন কি আসন্ন?

মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান এরই মধ্যে ভারত ও চীন সফর করেছেন। মালয়েশিয়ার সঙ্গেও দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়েছে। রাখাইনের যেসব অঞ্চল আরাকান মিয়ানমারের আর্মির নিয়ন্ত্রণে, সেসব এলাকায় আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে ইদানীং তীব্র বিমান হামলা চালাচ্ছে দেশটির সরকারি বাহিনী। চীন ও ভারতের মধ্যস্থতায় মিয়ানমার শিগগির রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে উদ্যোগী হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কি এটা হতে দেবে? রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে বিষফোড়া হিসেবে জিইয়ে রাখতে পারলেই তো তার লাভ! এ সময়ে তাই রাজনীতিতে আলোচনার মূল বিষয় হওয়ার কথা ছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগদান এবং সার্জিও গরের সফর। কিন্তু সেটি হয়নি। আলোচনা কেন্দ্রীভূত হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারে ঢুকে শিক্ষার্থীদের প্রহার এবং হবিগঞ্জ ও সিলেটে এনসিপি নেতাদের ওপর হামলার ঘটনা। কারও কারও সন্দেহ, মূল ইস্যু থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর লক্ষ্যে এগুলো সাজানো নাটক। কেউ বলছেন, দেশের এবং বাইরের ডিপ স্টেট জামায়াতকে এখন আর বিকল্প হিসেবে গণ্য করতে ভরসা পাচ্ছে না। তারা তাদের অন্য মিত্রদের নতুন মোড়কে হাজির করার ছক কষছে।

বাংলাদেশ ঘিরে সাম্রাজ্যবাদী নানা নীলনকশা বাস্তবায়নের পথে বরাবরই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাম প্রগতিশীল শক্তি। এখন আবার দেশের বন্ধ কলকারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া থেকে শুরু করে বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার অপচেষ্টা ঠেকাতে যখন বামপন্থীরা মাঠে নামতে চাইছে, তখনই চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির সুবাদে কোনো কোনো মহল দেশের বাম প্রগতিশীল দলগুলোর পেছনে লেগেছে। এ কথা ঠিক যে বাম প্রগতিশীল দলগুলোর ব্যর্থতার শেষ নেই। তাদের দুর্বলতার সুযোগেই দেশে উগ্র ডানপন্থী শক্তির এত পোয়াবারো। বাম প্রগতিশীল শক্তি দুর্বল না হলে জনপ্রত্যাশার বিপরীতে সৌদি নেতৃত্বাধীন স্পর্শকাতর একটি প্রতিরক্ষা জোটে দেশকে জড়ানো যেত না। কিন্তু শত দুর্বলতা সত্ত্বেও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাম প্রগতিশীল দল ও সংগঠনগুলো ছিল না—এমন অভিযোগ যারা করে, তাদের দুরভিসন্ধিটা আসলে কী, সেটা বোঝা দরকার। এই সমালোচকদের কে বোঝাবে যে বাম দলগুলোর যে শক্তি-সামর্থ্য, তাতে চব্বিশের আন্দোলনের সময় তাদের সব নেতা-কর্মী সশস্ত্র হয়ে নেমে পড়লেও নিয়ন্ত্রক হতে পারত না।

হ্যাঁ, একটা বিষয়ে কয়েকটি বাম দলে মতভেদ ছিল বেশ আগে থেকেই। সেই মতভেদটি ছিল বড় দুই দলের নেতৃত্বাধীন কোনো জোটে শামিল হওয়া না-হওয়া নিয়ে। এখন প্রশ্ন করাই যায়, সব বাম দল যদি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে ভিড়েও যেত, তাহলেও কি উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান থেমে যেত?

আসলে প্রগতিশীল বেশধারী যেসব দল-সংগঠনের গায়ে সাম্রাজ্যবাদী চুক্তির বিষয়ে চুপ থাকা কিংবা উগ্র ডানপন্থীদের সঙ্গে মাখামাখির কাদা লেপ্টে গেছে, তারাই এখন অন্যদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে সমালোচনার নামে মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছে। এরই মধ্যে এসব মিথ্যাচারের কিছু জবাবও এসেছে সংবাদমাধ্যমে। আমি বলতে চাই, এই মিথ্যাচারের পথ প্রশস্ত হয়েছে কোনো কোনো বাম দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে। কেউ কেউ অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো এমনভাবে অতিরঞ্জিত করে বাইরে ছড়িয়েছে যে এখন তাদের ছোড়া থুতু নিজেদের গায়েই পড়ছে। এই সুযোগে কিছুদিন আগেও যারা বামপন্থীদের ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ ট্যাগ দিয়ে হত্যাযজ্ঞ করে মব লেলিয়ে দেওয়ার এবং খিলাফতের লাইনে খেলার চেষ্টা করেছে, তারাও এখন ভোল পাল্টে বাম প্রগতিশীল সেজে নসিহত শুরু করেছে। এটাও আসলে লাল ঝান্ডা দিয়ে লাল ঝান্ডাকে ঠেকানো বা লোহা দিয়ে লোহা কাটার পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী কৌশল।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

ভয় নয়, জয়েই বাংলাদেশের মুক্তি

একই ব্যবস্থার দুটি পাতানো বিরোধিতার খেলা

গাছ কেটে কিসের উন্নয়ন

গ্যাস-সংকট সমাধানে আশু করণীয়

জলাবদ্ধতায় নগরের সংকট

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক

মায়ের মৃত্যু এবং কিছু প্রশ্ন

বিউটি রানী পাল ও শ্রাবণের মেঘ

দুয়ারে কড়া নাড়ছে আরেক মহামারি

পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে