হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদের অপার সম্ভাবনা

ড. শাহজাদ কুলি খান

বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদকে টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং নীল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি বঙ্গোপসাগর। প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রাঞ্চল এবং ২০০ নটিক্যাল মাইলের অর্থনৈতিক অঞ্চল শুধু মাছের আধার নয় বরং এটি জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান অবলম্বন, কর্মসংস্থানের উৎস এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম ক্ষেত্র। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর সংরক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে এই সম্ভাবনাই ভবিষ্যতে বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।

বঙ্গোপসাগরের জলরাশি নদীবাহিত পলি, লবণাক্ততা, স্রোত, গভীরতা ও তলদেশের বৈশিষ্ট্যের কারণে চারটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত। যথা মোহনাঞ্চল, উপকূলীয় স্বচ্ছ জলাঞ্চল, প্রবাল ও পাথুরে অঞ্চল এবং দূর সমুদ্রের উন্মুক্ত জলরাশি। প্রতিটি অঞ্চলের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হওয়ায়, সেখানে মাছের প্রজাতি, বিস্তৃতি এবং উৎপাদনশীলতাও ভিন্ন।

গভীরতার ভিত্তিতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা পেলাজিক, মিড-ওয়াটার (মেসোপেলাজিক) ও ডিমার্সাল। টুনা, ম্যাকারেল, সার্ডিন ও ইলিশের মতো পেলাজিক মাছ খোলা পানিতে বিচরণ করে; ল্যান্টার্নফিশ ও মধ্য-জলীয় চিংড়ি মধ্যবর্তী স্তরে বসবাস করে; আর ক্রোকার, গ্রুপার, স্ন্যাপার, রিবনফিশ, লবস্টার ও কাঁকড়ার মতো ডিমার্সাল প্রজাতি সমুদ্রতলের কাছাকাছি অবস্থান করে। বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেলাজিক ও ডিমার্সাল মৎস্যসম্পদই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রধান সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড, মিডল গ্রাউন্ড, সাউথ প্যাচেস ও সাউথ অব সাউথ প্যাচেস। উপকূল থেকে ৪০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত মূলত দেশীয় মাছ ধরার নৌকা, ৪০-২০০ মিটার পর্যন্ত ট্রলার এবং ২০০ মিটারের পর গভীর সমুদ্রে লং-লাইনার ট্রলার পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৫ হাজার ৭১৮টি যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌকা মাছ আহরণের জন্য এবং গভীর সমুদ্রে ২৩২টি অনুমোদিত ট্রলার ব্যবহার করা হয়। তবে ব্যবহৃত মাছ আহরণ উপকরণের মধ্যে গিলনেট ও সেট ব্যাগ নেটের আধিক্যই সবচেয়ে বেশি।

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের মোট মৎস্য উৎপাদন ছিল প্রায় ২.৯ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে সমুদ্র থেকে আহরণ হয়েছিল প্রায় ০.৫২ মিলিয়ন টন, অর্থাৎ মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭.৮৪ শতাংশ।

অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট মৎস্য উৎপাদন বেড়ে ৫.১১ মিলিয়ন টনে পৌঁছালেও সামুদ্রিক আহরণভিত্তিক উৎপাদন মাত্র ০.৫৭ মিলিয়ন টন, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ১১.১২ শতাংশ। অর্থাৎ মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও সামুদ্রিক মৎস্যের আপেক্ষিক অবদান ক্রমাগত কমছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মোট মৎস্য উৎপাদনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ২০০৯-১০ অর্থবছর পরবর্তী সময়ে যেখানে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৫.৬ শতাংশ, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে প্রায় ১.৯ শতাংশে। আশঙ্কা যে উৎপাদন বৃদ্ধির বর্তমান ধারা ভবিষ্যতে ধরে রাখতে হলে সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ বর্তমানে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে। উপকূলীয় ও অগভীর সমুদ্রে অতিরিক্ত আহরণ, ডিমওয়ালা ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মাছ ধরা, অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত ও অনথিভুক্ত মাছ আহরণ, বিধ্বংসী জাল ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত আহরণ সম্পদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্বের বহু দেশ অতিরিক্ত আহরণের কারণে তাদের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ হারিয়েছে, যা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং উপকূলীয় আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে মাছের প্রজননক্ষেত্র ও বিচরণপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক, শিল্পবর্জ্য, তেল দূষণ ও নদীবাহিত দূষক প্রবাল, সি-গ্রাস ও ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার প্রভাব পুরো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যের অভাব। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক মাছের মজুত, পুনরুৎপাদন ক্ষমতা এবং সর্বোচ্চ টেকসই আহরণমাত্রা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো সীমিত। ফলে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে টুনা, স্কিপজ্যাক, বিলফিশসহ উচ্চমূল্যের অনেক পেলাজিক প্রজাতির মাছ আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আধুনিক মাছ ধরার জাহাজ, দক্ষ মানবসম্পদ, কোল্ড চেইন, গভীর সমুদ্র উপযোগী বন্দর এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে এই সম্পদ এখনো কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, মেরিন অ্যাকুয়াকালচার, সামুদ্রিক বায়োটেকনোলজি এবং মূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্প বিকাশের মাধ্যমে নীল অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধিরও উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।

সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক স্টক মূল্যায়ন ও তথ্যভিত্তিক আহরণ নীতি প্রণয়ন। দ্বিতীয়ত, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ প্রতিরোধে আধুনিক নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ করা জরুরি। তৃতীয়ত, সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা কার্যকরভাবে পরিচালনা এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ। চতুর্থত, গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণের জন্য আধুনিক বহর ও প্রযুক্তি উন্নয়ন করা। পঞ্চমত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজনভিত্তিক গবেষণা এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি।

বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং নীল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তবে এই সম্পদ সীমাহীন নয়। এ সময়ের মধ্যে অব্যবস্থাপনা, অতি আহরণ এবং পরিবেশগত সংকট অব্যাহত থাকলে আগামী প্রজন্মকে তার মূল্য দিতে হবে। অন্যদিকে, বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর সংরক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গভীর সমুদ্রে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদকে টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে সুষম ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই সংকটের ছায়া পেরিয়ে সম্ভাবনার সমুদ্রে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ; আর নীল অর্থনীতি হয়ে উঠবে দেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল

বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং নীল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি বঙ্গোপসাগর। প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রাঞ্চল এবং ২০০ নটিক্যাল মাইলের অর্থনৈতিক অঞ্চল শুধু মাছের আধার নয় বরং এটি জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান অবলম্বন, কর্মসংস্থানের উৎস এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম ক্ষেত্র। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর সংরক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে এই সম্ভাবনাই ভবিষ্যতে বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।

বঙ্গোপসাগরের জলরাশি নদীবাহিত পলি, লবণাক্ততা, স্রোত, গভীরতা ও তলদেশের বৈশিষ্ট্যের কারণে চারটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত। যথা মোহনাঞ্চল, উপকূলীয় স্বচ্ছ জলাঞ্চল, প্রবাল ও পাথুরে অঞ্চল এবং দূর সমুদ্রের উন্মুক্ত জলরাশি। প্রতিটি অঞ্চলের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হওয়ায়, সেখানে মাছের প্রজাতি, বিস্তৃতি এবং উৎপাদনশীলতাও ভিন্ন।

গভীরতার ভিত্তিতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা পেলাজিক, মিড-ওয়াটার (মেসোপেলাজিক) ও ডিমার্সাল। টুনা, ম্যাকারেল, সার্ডিন ও ইলিশের মতো পেলাজিক মাছ খোলা পানিতে বিচরণ করে; ল্যান্টার্নফিশ ও মধ্য-জলীয় চিংড়ি মধ্যবর্তী স্তরে বসবাস করে; আর ক্রোকার, গ্রুপার, স্ন্যাপার, রিবনফিশ, লবস্টার ও কাঁকড়ার মতো ডিমার্সাল প্রজাতি সমুদ্রতলের কাছাকাছি অবস্থান করে। বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেলাজিক ও ডিমার্সাল মৎস্যসম্পদই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রধান সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড, মিডল গ্রাউন্ড, সাউথ প্যাচেস ও সাউথ অব সাউথ প্যাচেস। উপকূল থেকে ৪০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত মূলত দেশীয় মাছ ধরার নৌকা, ৪০-২০০ মিটার পর্যন্ত ট্রলার এবং ২০০ মিটারের পর গভীর সমুদ্রে লং-লাইনার ট্রলার পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৫ হাজার ৭১৮টি যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌকা মাছ আহরণের জন্য এবং গভীর সমুদ্রে ২৩২টি অনুমোদিত ট্রলার ব্যবহার করা হয়। তবে ব্যবহৃত মাছ আহরণ উপকরণের মধ্যে গিলনেট ও সেট ব্যাগ নেটের আধিক্যই সবচেয়ে বেশি।

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের মোট মৎস্য উৎপাদন ছিল প্রায় ২.৯ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে সমুদ্র থেকে আহরণ হয়েছিল প্রায় ০.৫২ মিলিয়ন টন, অর্থাৎ মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭.৮৪ শতাংশ।

অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট মৎস্য উৎপাদন বেড়ে ৫.১১ মিলিয়ন টনে পৌঁছালেও সামুদ্রিক আহরণভিত্তিক উৎপাদন মাত্র ০.৫৭ মিলিয়ন টন, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ১১.১২ শতাংশ। অর্থাৎ মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও সামুদ্রিক মৎস্যের আপেক্ষিক অবদান ক্রমাগত কমছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মোট মৎস্য উৎপাদনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ২০০৯-১০ অর্থবছর পরবর্তী সময়ে যেখানে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৫.৬ শতাংশ, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে প্রায় ১.৯ শতাংশে। আশঙ্কা যে উৎপাদন বৃদ্ধির বর্তমান ধারা ভবিষ্যতে ধরে রাখতে হলে সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ বর্তমানে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে। উপকূলীয় ও অগভীর সমুদ্রে অতিরিক্ত আহরণ, ডিমওয়ালা ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মাছ ধরা, অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত ও অনথিভুক্ত মাছ আহরণ, বিধ্বংসী জাল ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত আহরণ সম্পদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্বের বহু দেশ অতিরিক্ত আহরণের কারণে তাদের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ হারিয়েছে, যা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং উপকূলীয় আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে মাছের প্রজননক্ষেত্র ও বিচরণপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক, শিল্পবর্জ্য, তেল দূষণ ও নদীবাহিত দূষক প্রবাল, সি-গ্রাস ও ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার প্রভাব পুরো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যের অভাব। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক মাছের মজুত, পুনরুৎপাদন ক্ষমতা এবং সর্বোচ্চ টেকসই আহরণমাত্রা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো সীমিত। ফলে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে টুনা, স্কিপজ্যাক, বিলফিশসহ উচ্চমূল্যের অনেক পেলাজিক প্রজাতির মাছ আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আধুনিক মাছ ধরার জাহাজ, দক্ষ মানবসম্পদ, কোল্ড চেইন, গভীর সমুদ্র উপযোগী বন্দর এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে এই সম্পদ এখনো কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, মেরিন অ্যাকুয়াকালচার, সামুদ্রিক বায়োটেকনোলজি এবং মূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্প বিকাশের মাধ্যমে নীল অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধিরও উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।

সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক স্টক মূল্যায়ন ও তথ্যভিত্তিক আহরণ নীতি প্রণয়ন। দ্বিতীয়ত, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ প্রতিরোধে আধুনিক নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ করা জরুরি। তৃতীয়ত, সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা কার্যকরভাবে পরিচালনা এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ। চতুর্থত, গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণের জন্য আধুনিক বহর ও প্রযুক্তি উন্নয়ন করা। পঞ্চমত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজনভিত্তিক গবেষণা এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি।

বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং নীল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তবে এই সম্পদ সীমাহীন নয়। এ সময়ের মধ্যে অব্যবস্থাপনা, অতি আহরণ এবং পরিবেশগত সংকট অব্যাহত থাকলে আগামী প্রজন্মকে তার মূল্য দিতে হবে। অন্যদিকে, বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর সংরক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গভীর সমুদ্রে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদকে টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে সুষম ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই সংকটের ছায়া পেরিয়ে সম্ভাবনার সমুদ্রে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ; আর নীল অর্থনীতি হয়ে উঠবে দেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

ড. শাহজাদ কুলি খান, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল

প্রিয় ঢাকা শহরকে বাঁচাতে হবে

সরলতার মহিমা ও সমাজের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা

পুতিন কি মৃত্যুকে জয় করতে পারবেন

জর্ডানপ্রবাসীদের কষ্টের কথা কেউ জানে না

শিক্ষার করুণ দশা কি চলতে থাকবে

হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আর কত দিন

এই মৃত্যুর দায় কার

গণ-আন্দোলন, নাকি মেটিকুলাস ডিজাইন

সৌন্দর্য চিকিৎসায় গড়ে উঠছে নতুন অর্থনীতি

সার্জিও গরের সফর প্রশ্ন, কূটনীতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা