বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর দিনটি একদিকে যেমন চরম নাটকীয় ও রক্তক্ষয়ী, অন্যদিকে তেমনিভাবে তাৎপর্যময়। ১৯৭৫ সালের এই দিনটির ব্যাখ্যা নিয়ে দলীয় ও রাজনৈতিক মহলে নানামুখী মতভেদ থাকলেও, এর অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক সত্য হলো—এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের এক চরম রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক শূন্যতার মুহূর্তে ‘সিপাই-জনতার’ এক প্রতীকী ও স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের একটি স্বাধীন মানচিত্র এনে দিলেও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ দাঁড়িয়েছিল এক বিধ্বস্ত ভিত্তির ওপর। দারিদ্র্য, প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে দ্রুত দুঃস্বপ্নে পরিণত করে। বিশেষ করে, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে লাখো মানুষের প্রাণহানি এবং চোরাচালান-দুর্নীতির বিস্তার জাতিকে এক গভীর হতাশায় নিমজ্জিত করে। মানুষের মনে জন্ম নেয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি চরম বঞ্চনার বেদনা ও ক্ষোভ।
এই অস্থির পরিস্থিতিতে বাকশালের একদলীয় শাসনব্যবস্থায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা সংকুচিত করে। সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে মাত্র চারটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন পত্রিকা চালু রাখা হয়। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর একাংশের ভেতর তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ জমতে থাকে। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় দেশের সামগ্রিক চিত্র হয়ে ওঠে দমবদ্ধ।
এই সংক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোরে সেনাবাহিনীর কয়েকজন জুনিয়র অফিসারের নেতৃত্বে এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়।
এর তিন মাস পর ৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। ৩ নভেম্বরে আরেকটি কলঙ্কিত ও কালো অধ্যায় রচিত হয়। ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। ফলে দেশ রাজনৈতিক নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে।
এ চরম শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ল্যান্স নায়েক খন্দকার জিয়াউল হকের নেতৃত্বে ঢাকা সেনানিবাসে সিপাইরা এক বিদ্রোহের মাধ্যমে বন্দিদশা থেকে জনপ্রিয় সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে। তিনি মুক্ত হওয়ার পর ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। ট্যাংকের ওপর সেনা ও সাধারণ মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করে। সেই দিন ঢাকার আকাশে-বাতাসে উচ্চারিত হয়েছিল এক ঐতিহাসিক স্লোগান ‘সিপাই-জনতার ঐক্য অটুট থাকুক’।
৭ নভেম্বরকে অনেকে কেবলই একটি সামরিক পালাবদল বা জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আরোহণের ঘটনা হিসেবে দেখতে চান। তবে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তৎকালীন রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে সাধারণ সেনাদের ভূমিকা এটিকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। সেনা ও জনতার এই নজিরবিহীন ঐক্য প্রমাণ করেছিল যে, জাতির চূড়ান্ত সংকটকালে বিভক্তি নয়, জাতীয় সংহতিই হতে পারে টিকে থাকার মূল শক্তি।
পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও রক্তাক্ত সেনাবাহিনীতে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করেন। তাঁর দূরদর্শী উদ্যোগে জন্ম নেয় ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণা, যা ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে দেশের সব নাগরিককে এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করেছিল।
তবে ইতিহাসের এই মোড় পরিবর্তনের ব্যাখ্যা নিয়ে বাংলাদেশে আজও তীব্র রাজনৈতিক দ্বিমত ও বিতর্ক বিরাজমান। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো একে ‘জাতীয় সংহতি ও বিপ্লব দিবস’ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে, যেখানে তারা এটিকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিন হিসেবে গণ্য করে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা একে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। কারণ, এই অভ্যুত্থান চলাকালীন এবং এর পরবর্তী সময়ে খালেদ মোশাররফ, এটিএম হায়দার, কর্নেল তাহের এবং খন্দকার নাজমুল হুদার মতো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল এবং এটি দেশে দীর্ঘ সামরিক শাসনের সূচনা করেছিল। আবার জাসদ দিনটিকে ‘সিপাই-জনতার অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে পালন করে। কারণ, তাদের অঙ্গসংগঠন ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ এই বিদ্রোহের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
তবে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দিবসটিকে যেভাবে একক দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল, বর্তমান সময়ে তা নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ৭ নভেম্বরের মূল শিক্ষা হলো, যখনই কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়, তখন জনগণের জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তিগুলোর সংহতিই দেশকে রক্ষা করতে পারে।
৭ নভেম্বর ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক দৃশ্যমান প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন যখন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নানা চক্রান্তে ভাঙতে বসেছিল, তখনই এ দিনের আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছিল জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ধ্বংস করা যায় না। আর ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যার কারণে দিবসটি বিতর্কিত হলেও, এর ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট হওয়ার সত্যতাকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
একটি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে এবং তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় সংহতি গড়ে তোলা অপরিহার্য। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন আর অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে বিভক্তি নয়, ঐক্যই জাতির টিকে থাকার একমাত্র শর্ত।
জাতীয় সংহতি দিবস আমাদের শেখায়, জাতি যখন গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, তখন কোনো জাদুকরি ফর্মুলা নয়, বরং আপামর জনগণের ঐক্যের আলোই তাকে নতুন ভোরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ৭ নভেম্বর সেই ভোরের আলোকরেখা, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জনগণের সচেতনতা, সেনাবাহিনীর পেশাদারত্ব ও দেশপ্রেম এবং সামগ্রিক রাষ্ট্রচেতনার সঠিক মিশ্রণই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে। ৭ নভেম্বর কোনো একক ব্যক্তির নয়, এটি পুরো বাংলাদেশের সংহতির ভেতরে নিহিত শক্তির এক শাশ্বত স্মারক।
সালেক উদ্দিন, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক