মার্কিন-ইসরায়েলের আগ্রাসনের মাধ্যমে সূচিত ইরান সংঘাত বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতেও তীব্র প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর মাধ্যমে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ইউরোপে জ্বালানি ব্যয় বাড়বে, এশিয়ায় (চীন, ভারত, জাপান) আমদানি খরচ বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ, ইরান সংকট চলতে থাকলে এবং হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ কমতে পারে ২০ শতাংশের মতো। এর ফলে জ্বালানির দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০-১৩০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। এমনকি বিকল্প পথ, যেমন লোহিতসাগর ব্যবহার করলেও লজিস্টিক খরচ বাড়বে। যার ফলে, দীর্ঘ সময়ের জন্য জ্বালানির দাম ব্যাপক হারে উচ্চ থাকার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭০ থেকে ১১০ ডলারের বেশি উঠেছে। একবার তো ১২০ ডলার পর্যন্তও পৌঁছে গিয়েছি। কাতারের গ্যাস উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের তেল উৎপাদন দৈনিক ৬৭ লাখ ব্যারেল কমেছে। এতে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি দশমিক ৪ থেকে দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং জিডিপি দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে, যদি বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০ শতাংশ পর্যন্তও বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতি দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে ইউরোপ ও এশিয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হু হু করে বেড়ে যাবে। বিশেষ করে, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর ধাক্কা হবে ভয়াবহ।
এরই মধ্যে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো সিংহভাগ জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো এলএনজি কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। পাকিস্তানের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট (চলতি হিসাবের ঘাটতি) গত দুই মাসে ১৫ শতাংশ বেড়েছে, যাতে বড় ভূমিকা রেখেছে ইরানে চলমান সংকট। এর ফলে দেশগুলোতে প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, যা শিল্প উৎপাদন স্থবির করে দিয়েছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল (ইরান ও প্রতিবেশী দেশগুলো) বিশ্বের অন্যতম প্রধান সার উৎপাদনকারী কেন্দ্র। ইউরিয়া সারের দাম গত তিন সপ্তাহে টনপ্রতি ৪৫০ ডলার থেকে বেড়ে ৬৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সারের কাঁচামাল অ্যামোনিয়ার সরবরাহ বিশ্বে প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ইথিওপিয়া ও কেনিয়ার মতো আফ্রিকান দেশগুলোতে সারের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় কৃষকেরা চাষাবাদ কমিয়ে দিয়েছেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্ক করে বলেছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই দেশগুলোতে খাদ্য উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ কমে যেতে পারে, যা দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়াবে। আর এই পরিস্থিতি তৈরিতেও ইরান সংকট গুরুতর ভূমিকা রেখেছে।
এই সংঘাত কেবল জ্বালানির বাজারেই অস্থিরতা তৈরি করেনি, ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নও ঘটিয়েছে। যার ফলে আমদানি সব পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। গত এক মাসে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার মান আরও প্রায় ৪ শতাংশ এবং মিসরীয় পাউন্ডের মান প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। বিনিয়োগকারীরা উদীয়মান বাজার থেকে গত এক মাসে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নিয়েছেন, যা অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করেছে।
ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যাবে। ফলে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যাবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত খালি হয়ে যাবে। এর ফলে যেসব দেশ আগে থেকেই বৈদেশিক ঋণে জর্জরিত (যেমন পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কা) মুদ্রার অবমূল্যায়ন তাদের ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা দেশগুলোকে দেউলিয়া হওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ও লোহিতসাগরে অস্থিরতার কারণে জাহাজ চলাচলের রুট বদলে গেছে। সাংহাই থেকে ইউরোপ বা দক্ষিণ এশিয়ায় কনটেইনার পরিবহনের খরচ ২৫০০ থেকে বেড়ে ৬ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। বিমা খরচ বেড়েছে প্রায় ৩০০ শতাংশের মতো। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে লিড টাইম (পণ্য পৌঁছানোর সময়) ১৫-২০ দিন বেড়ে যেতে পারে। বাড়তি জাহাজ ভাড়া যোগ হওয়ায় ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিতে পারেন, যা পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধিকে সরাসরি আঘাত করছে।
ইরান সংকট চলতে থাকলে সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সাধারণত, যখন কোনো দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থমকে যায় এবং বাজারে জিনিসের দাম আকাশচুম্বী হতে থাকে, তখন তাকে স্ট্যাগফ্লেশন বলে। সাধারণ অর্থনৈতিক নিয়মে (ফিলিপস কার্ভ অনুযায়ী), যখন বেকারত্ব কমে তখন মূল্যস্ফীতি বাড়ে, আর যখন মন্দা আসে তখন দাম কমে যায়। কিন্তু স্ট্যাগফ্লেশন এই চিরাচরিত নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। এর প্রধান তিন বৈশিষ্ট্য হলো—মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি না বাড়া বা খুব ধীরগতিতে চলা, কলকারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় মানুষের চাকরি চলে যাওয়া এবং বাজারে নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকা।
তাত্ত্বিকভাবে স্ট্যাগফ্লেশনের দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়। সাপ্লাই শক অর্থাৎ, যখন হঠাৎ করে কোনো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের (যেমন জ্বালানি তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ কমে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে তেলের দাম বাড়লে অর্থাৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে কোম্পানিগুলো পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হবে এবং একই সঙ্গে লোকসান এড়াতে কর্মী ছাঁটাই করবে, যা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিকে কঠিন করে তুলবে।
বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে শেয়ারবাজার থেকে মূলধন তুলে নিয়ে স্বর্ণ বা মার্কিন ডলারের মতো নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারে। ফলে স্বর্ণ ও ডলারের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারে, যা অবধারিতভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দেবে। এই অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার কমানোর বদলে বাড়িয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে দেবে।
ইরানে চলমান সংকট, ১৯৭০-এর দশকে ওপেকের তেল নিষেধাজ্ঞার সময় বিশ্ব প্রথমবারের মতো যে বড় আকারের স্ট্যাগফ্লেশনের স্বাদ পেয়েছিল, সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখনো তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল এবং আমেরিকার মতো উন্নত অর্থনীতিও স্থবির হয়ে পড়েছিল।
বর্তমান এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে একপ্রকার ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভারত, চীন এবং ইউরোপের মতো জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি রপ্তানিকারক হওয়ায় দেশটি তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকলেও বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা থেকে তারাও মুক্ত নয়। সংঘাত যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি তত প্রকট হবে।