বাংলাদেশ আমাদের জন্মভূমি। তার বদলে যাওয়া বা তার যেকোনো পরিবর্তন আমাদের চোখে পড়ে। আজকাল ভালো কোনো পরিবর্তন চোখেই পড়ে না। যা দেখি তার বেশির ভাগই মূলত সামাজিক অনাচার আর অন্যায়। খুব বেশি দিন আগের কথা না, আমাদের দেশে পাড়ায় পাড়ায় হারমোনিয়ামের সুরের ধারায় সন্ধ্যা নামত। বাড়িতে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বা অন্য গানের পসরা সাজিয়ে বসতেন বাড়ির নারীরা। দিন পাল্টেছে। বহুতল দালানে ঘেরা শহর বা মফস্বলে এখন আর সুরের শব্দ পাওয়া যায় না। কেন যায় না?
মানুষ কি খুব ব্যস্ত? নাকি অন্য কোনো কারণ? দুটো কারণ আমরা সহজেই খুঁজে পাই—এক. মানুষ ডিজিটালাইজড হওয়ার নামে মোবাইল ফোন আর কম্পিউটারে মুখ গোঁজা এক জাতি এখন। এর বাইরে তার কোনো ভুবন যেন আর নেই!
দ্বিতীয় কারণ: হঠাৎ করে বাঙালির মনে সন্দেহ, সংশয় আর দুর্বলতা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে নাকি গান বা সুরে থাকতেই পারবে না। এই প্রক্রিয়া আজকের না। বিগত শাসনামলে যখন মনে করা হয়েছিল প্রগতি আর স্থিতি নিশ্চিত, তখন কিন্তু ভেতরে-ভেতরে ইঁদুর জাল কাটছিল। ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছিল প্রতিক্রিয়াশীলতার নানা উৎপাত। এমনই অবস্থা যে একমাত্র তখনকার প্রধানমন্ত্রী, যিনি এখন দেশত্যাগী, কারও মতে পালিয়ে বাঁচা, তাঁর কথা ছাড়া কারও কথায় কোনো কাজ হতো না। সে আমলে সুর আর সংগীত হতো বটে, তা ছিল লোকদেখানো। প্রশাসন আর রাজার ভয়ে চুপ থাকা দানবেরা তলে তলে ঠিকই তৈরি হচ্ছিল।
রাজনীতি এ লেখার উদ্দেশ্য না। এখন এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছে, কেউ সুর বা সাধনার স্বপ্ন দেখতেও ভয় পাবেন। কারণ, তারা ভয় লাগিয়ে আনন্দ পায়। আজকাল বড় অভাব পড়েছে মানবিকতার। কী দেশ কী হয়ে গেল! সেই কবে থেকে বাঙালি জাতি-ধর্মনির্বিশেষে একসঙ্গে বাস করে আসছে। তার মূল ভিত্তি ছিল সহাবস্থান আর ভালোবাসা। মায়া, মমতা, ভালোবাসা তো সহজে যায় না। কেড়ে নেওয়াও কঠিন। তাই এরা সম্বল করল ধর্মকে। সবচেয়ে সংবেদনশীল আর নাজুক বিষয়টি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে এখন ধর্মব্যবসা আর নিয়ম যেন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।
হয়েছে কারণ, আগের আমলে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। অযোগ্য, অপদার্থ আর সুযোগসন্ধানী দলের চামচা দিয়ে কাজ হয় না। হয়তো চামচামি আর সময় ব্যয় হতে পারে। সে সুযোগে চতুর স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা তাদের কাজ করে গেছে গোপনে। যখন সময় এল, আমরা দেখলাম, এখন দেখছি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে নৈতিকতা আর আদর্শ। তারা ভুল করেনি। ভুল করে না। আসল জায়গায় আঘাত হানছে তারা। স্বর্গ-নরক আর বাঁচা-মরার এক লড়াই টেনে এনে মানুষের সুকুমার বৃত্তি বন্ধ করায় অনেকটাই সফল তারা। আজকের বাংলাদেশ কেন জানি অচেনা আর অজানা হয়ে যায় মাঝে মাঝে।
কিন্তু আমাদের দেশটাই এমন—যখন মনে হবে আর কোনো পথ নেই, আর কোনো ভরসা নেই, তখনই আমাদের দেশ রুখে দাঁড়ায়—বলে দেয় কী করতে হবে আর কোনটা করার দরকার নেই। এই শক্তি আমি দীর্ঘ সময়কাল ধরে দেখে আসছি। এবার যখন মানুষ নানা কারণে ভীত আর পরাজিত, তখনই সামনে এসেছে এক তরুণ। কে এই তরুণ? কী তার পরিচয়? জানার দরকার নেই আমাদের। শুধু জানতে হবে তার সাহস আর শক্তি। একগাদা মানুষের সামনে বীরের মতো অসাম্প্রদায়িকতা আর বাঙালির কথা বলা এই ছেলেটি নিজের পরিচয় দিয়েছে এই বলে, ‘আমি আগে একজন মানুষ’। মনে হচ্ছিল কোনো এক লালন বা হাসন রাজা কথা বলছেন। ধীর অথচ শাণিত ছেলেটি যেন কবি নজরুলের প্রতিবিম্ব। এই ছেলেটিকে ঘিরে মানুষের স্পন্দন আর ভালোবাসা মনে করিয়ে দিয়েছে—‘ভয় নাই, ওরে ভয় নাই!’ সত্যি আমাদের ভয় নেই। আছে কপট হিংসা ছায়ে কিছু দানবের আচরণ।
এই তরুণের পরপরই দৃশ্যপটে এলেন এক শিক্ষক। ফেঞ্চুগঞ্জের স্কুলশিক্ষক বিউটি রানী পাল। ডিফারেন্ট টাচ ব্যান্ডের বিখ্যাত গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটির সঙ্গে নাকি ‘নেচেছিলেন’। নেচেছিলেন? না, আসলে মনের খুশি প্রকাশ করেছিলেন। ব্যস, এতেই নড়ে উঠল পুরুষতন্ত্র। নড়েচড়ে বসা উগ্রবাদ ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁর ওপর। কিন্তু খেলা এখানেই শেষ না। জীবনে যাঁরা মেজবাহর গাওয়া এই গানটি শোনেননি, জানতেন না, তাঁরাও আজ এর সঙ্গে রিল বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভাসিয়ে দিয়েছেন। শুধু মেয়ে বা নারীরা না, পুরুষ শিক্ষকেরাও নেমেছেন।
খোলা চুল, হিজাবি, বোরকা, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, শার্ট-প্যান্ট—সবার স্রোতে ভেসে গেছে অপশক্তি। জয় হলো কার? সেই শিক্ষকের। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে?’ এই গান এখন সুপার ডুপার ভাইরাল! এটাই দেশের এবং এটাই মানুষের শক্তি। এটাই নারীর বিজয়।
তাহলে একটা বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশ জেগে আছে। তার ভেতরের শক্তি হয়তো সব সময় বোঝা যায় না কিন্তু যখন সে রুখে দাঁড়ায়, তখনই আমরা তা টের পাই। আমাদের স্বপ্ন আর বিশ্বাসের স্বদেশকে বিদেশে ধারণ করা বাঙালি সব সময় পাশে আছে। যেমন, সেদিন আমরা মিলিত হয়েছিলাম অগ্রজ গামা আবদুল কাদিরের সম্মানে প্রকাশিত একটি সম্মাননা গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবে। হলভর্তি বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ আর ইতিহাসের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ, তার প্রমাণ মিলেছে কথা, গান আর মানুষের সহমতে। গামা আবদুল কাদির মুক্তিযুদ্ধ আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্য লড়াই করা এক অগ্রজ। এ বিষয়ে তিনি নির্ভীক। বাংলাদেশ ও অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে তাঁর ভূমিকা স্পষ্ট। তারপরও সেদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পথের মানুষ এসে ভিড় করেছিলেন মিলনায়তনে। তাঁদের একটাই কথা—আগে দেশ, তারপর অন্য কিছু। এটাই আমাদের চাওয়া।
আমাদের দেশ মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত এক ভূমি। চাইলেই তার গান, পতাকা, কবিতা বা ভাবনা কেড়ে নেওয়া যায় না। যারা তা ভাবে বা তা হবে বলে মনে করে, তারা বোকার স্বর্গে বাস করে। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।
লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট