হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ থেকে পুশ ইন

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন পথে

আব্দুর রহমান 

বিএসএফের অবৈধ পুশ ইন ঠেকাতে কাজ করে যাচ্ছে বিজিবি। ছবি: এএফপি

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিবাসন নতুন কোনো ঘটনা নয়। ঐতিহাসিকভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও স্বাধীন বাংলাদেশ পরিচয়ের দিক থেকে প্রায় একই রকম হওয়ায় অতীতে এই অঞ্চলে মানুষের অবাধ যাতায়াত ছিল। ১৯৪৭ সালের বিভাজনের পর নতুন সীমান্ত ও আইনি কাঠামো তৈরি হওয়ার পরও দুই অংশের মধ্যে যাতায়াত ছিল। একই কথা প্রযোজ্য আসাম এবং ত্রিপুরার ক্ষেত্রেও। যদিও এই দুই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের যোগাযোগ তুলনামূলক কম।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ ভারতে আশ্রয় নিলেও স্বাধীনতার পর তারা ফিরে আসে। স্বাধীনতার পর যে মানুষ ভারত থেকে বাংলাদেশে আসেনি বা বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায়নি—এমনও নয়। তখনো চলাচল ছিল। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিক থেকে ভারত সীমান্তে বেড়া নির্মাণ থেকে শুরু করে নানা ধরনের কড়াকড়ি আরম্ভ করলে সেটাও কমে আসে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বিকশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই হার কমে আসতে থাকে। তবে সীমান্ত নিশ্ছিদ্র না হওয়ায় অভিবাসন চলতেই থাকে।

পাকিস্তান-ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে এই অবৈধ অভিবাসন নিয়ে আলাপ-আলোচনাও হয়। ১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকে ভারতের রাজনীতিতে এই বিষয়টি ব্যাপক হাওয়া পায়। পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মধ্যে এই বিষয়ে চুক্তি হয়। এরপর দীর্ঘদিন এই ইস্যু ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার বিষয় না হলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিক থেকে বর্তমানে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিষয়টিকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করে। তারা ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ থেকে ‘অবৈধ অভিবাসনের’ ইস্যুটি নিয়ে কথা বলতে থাকে। একই সময়ে, ভারতের একাডেমিয়াও এই বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করে। তবে তার পরিসর ছিল বেশ ছোট। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য ইস্যুর সঙ্গে ‘অবৈধ অভিবাসন’ ইস্যুকে আলোচনায় এনে বিজেপি ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং সরকার গঠন করে।

বিজেপির সেই সরকার এবং এরপরের কংগ্রেস সরকারগুলো পরের দেড় দশক বা তারও কিছুটা বেশি সময় ধরে আর তথাকথিত ‘অবৈধ অভিবাসন’ ইস্যু নিয়ে খুব বেশি সরব ছিল না। কিন্তু ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি আবারও বিষয়টিকে সামনে আনে। সে বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে মোদি বলেন, ‘বাংলাদেশি অভিবাসীদের তল্পিতল্পা গোটাতে হবে।’ মোদির সেই অবস্থান জাতীয় নির্বাচনে বিজেপির ভালো ফলাফলে সহায়তা করে এবং বিজেপি কেন্দ্রে সরকার গঠন করে। তার পর থেকে বিজেপি আজ অবধি ভারত শাসন করে আসছে।

তবে বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকেনি। এরপর, ২০২৪ সালের আগে-পরে ভারতের লোকসভা নির্বাচন, বিভিন্ন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে ‘বাংলাদেশি ঘুসপেতিয়া’ বা অনুপ্রবেশকারী ইস্যু ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। বিহারে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং বাংলাদেশি মুসলমানদের ‘অসুর’ বলে আখ্যা দেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি পূর্ণিয়ায় এক সমাবেশে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অনেক অসুর এসেছে, আমাদের সেই অসুরদের বধ করতে হবে।’ যেহেতু আধুনিক সময়ে এই ‘অসুর’ বধ করা সম্ভব নয়, তাই তাদের নিজেদের এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে—এমনটাই মূলত বিজেপির রাজনীতির বয়ান। সেই বয়ানের আলোকেই ভারত রাষ্ট্র বর্তমানে এই ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ঘরের মাঠে ফায়দা তুলতে এবং অবশ্যই বাংলাদেশকে চাপে রাখতে।

ঘরোয়া রাজনীতিতে বিজেপি স্রেফ তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী/অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু ব্যবহার করে ব্যাপক ফায়দা তুলেছে। ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম ইস্যু ছিল এটি। একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি করা হয় বাংলাদেশের কাছাকাছি আরেক রাজ্য ঝাড়খন্ডেও। তবে এবারে বিজেপি আর সফল হয়নি। স্থানীয়দের স্বাজাত্যবোধ এবং জনমিতিক কারণে বিজেপি ব্যর্থ হয়। কিন্তু ঝাড়খন্ডের রাজ্য রাজনীতিতে তারা স্থানীয়দের প্রভাব কমিয়ে দিতে সফল হয়।

একইভাবে, আসামে মিঞা মুসলিম—বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মুসলিমদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়—ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিজেপি টানা দুবার সরকার গঠন করেছে। আসামে ভারতীয় হিন্দু এবং তথাকথিত ‘বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মুসলমান’ বিভাজনের কারণে বিজেপির জয়ের মার্জিনও বিশাল। তবে, কেবল বাংলাদেশসংলগ্ন রাজ্যগুলোতে নয়, বিজেপি এই কার্ড খেলেছে উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট এবং অন্যান্য এলাকায়। তবে এসব এলাকায় এর প্রভাব খুবই কম।

ঘরোয়া রাজনীতিতে ব্যবহারের পাশাপাশি বর্তমানে ভারত সরকার বাংলাদেশকে চাপে রাখতেও এই বিষয়টিকে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা হিসেবে ভারতকে বেশ কিছু অনুরোধ করা হয়। এর মধ্যে আছে স্থগিত ভিসা প্রক্রিয়া ফের চালু করা, দুই দেশের মধ্যে স্থল বাণিজ্য আবারও চালু করা, গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন। কিন্তু দিল্লির তরফ থেকে তেমন কোনো ইতিবাচক বার্তা ঢাকা পায়নি। ফলে, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বরফ এখনো সেই অর্থে গলেনি।

ভারত এরই মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গসংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় ‘পুশ ইন’ চেষ্টা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং স্থানীয় জনগণ ভারতের একাধিক পুশ ইন চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টি, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে প্রায় তলানিতে থাকা দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও চাপের মুখে ফেলেছে।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের পুশ ইন চেষ্টার ঘটনাগুলো খেয়াল করলে দেখা যায়, তারা রাতের আঁধারে বা সীমান্তের আলো বন্ধ করে দিয়ে জোরপূর্বক কিছু মানুষকে বাংলাদেশে পুশ ইন করছে। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইন বা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির লঙ্ঘন। বিজিবির দায়িত্বরত কর্মকর্তারাও বলছেন, এভাবে পুশ ইন বেআইনি। কারণ, প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট নিয়ম আছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আলোকে ভারত চাইলেই একতরফাভাবে কাউকে ‘পুশ ইন’ করতে পারে না। বিদেশি বা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভারতের নিজস্ব আইন রয়েছে। তবে আইনগতভাবে কাউকে ‘অবৈধ’ চিহ্নিত করার অর্থ এই নয় যে তাঁকে সরাসরি সীমান্ত পার করে দেওয়া যাবে। এর জন্য দুই দেশের মধ্যে সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা এবং দ্বিপক্ষীয় কার্যপদ্ধতিও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন (১৯৫১ সালের শরণার্থী সনদ) অনুযায়ী, ‘রাষ্ট্রসমূহ কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো ভূখণ্ডে ফেরত পাঠাতে পারে না, যেখানে তাঁর জীবন বা স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন হবে।’ কিন্তু গত কয়েক দিনে ভারত নারী-শিশুসহ যতজনকে পুশ ইন করেছে, তারা সবাই শূন্যরেখায় আটকে ছিল। এসব মানুষ না বাংলাদেশে যেতে পেরেছে, না ভারতে ফিরতে পেরেছে। প্রায় ২৫-৩০ ঘণ্টা ধরে অনেকেই শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে, হাঁটুপানিতে বসে রাত কাটিয়েছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।

দুই দেশের মধ্যে অপরাধী বা বন্দী হস্তান্তরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকা-নয়াদিল্লির মধ্যে বন্দিবিনিময় সহজ করতে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৫ সালে এই চুক্তির আওতায় ভারতের আসামের উলফা নেতা অনুপ চেটিয়া এবং বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুন মামলার আসামি নূর হোসেনকে পারস্পরিক হস্তান্তর করা হয়েছিল।

২০১৩ সালের এই মূল চুক্তিতে মোট ১২টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এই চুক্তির আলোকে কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পেতে বা পাঠাতে এক দেশ অন্য দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক আবেদন করে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত বা কর্তৃপক্ষ আবেদনের পক্ষে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করে। আদালত সন্তুষ্ট হলেই কেবল সরকার ওই ব্যক্তিকে হস্তান্তরের চূড়ান্ত আদেশ দেয়।

কিন্তু ভারত এই চুক্তির কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করছে না। কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা এই পুশ ইন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতকে ১২-১৩টি চিঠি পাঠানো হয়েছে এই ইস্যুতে। ঢাকা সতর্ক করে বলেছে, পুশ ইন দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে প্রভাব ফেলবে।

দুই নিকট প্রতিবেশীর মধ্যে প্রায় দুই বছর ধরে চলা কূটনৈতিক শীতলতা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করেছে এই পুশ ইন। এই অবস্থায় বড় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত যদি বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও তলানিতে ঠেকবে।

তেলাপোকাদের বিদ্রোহ কি ভারতে নতুন রাজনীতির জন্ম দিচ্ছে

কী দেখেছি, আরও কী দেখব

স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর গুণগত ‘অর্জন’

পাহাড় কাটা ও সজলদের জীবন

তেলাপোকার উত্থান ও তারুণ্যের ক্ষোভ

টিকার ট্রায়াল ও আফ্রিকার বিপন্ন শৈশব

এক্সপার্ট রিটায়ার্ড পিপলস পুল

সহজ সমাধান তবু উপেক্ষিতই থাকবে

তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে

বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কখনোই সুদৃঢ় নয়: উম্মে ওয়ারা