হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রিকনসিলিয়েশনের পথ কি রুদ্ধই থাকবে

এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রস্তাবে কেউ কেউ ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে তেড়ে আসবেন। তাতে কিন্তু সমস্যাটি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে না। তাঁরা হয়তো বলবেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তো এখনো উদ্ধত, সংস্কারহীন ও অনুশোচনাহীন মনোভাব দেখিয়ে চলেছে।

আজাদুর রহমান চন্দন

ছবি: এআই

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলার জন্য ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ (সত্য ও পুনর্মিলন) কমিশন গঠন করার প্রয়োজনীয়তার আলোচনা ওঠার পরপরই তা ধামাচাপা পড়ে যায়। যদিও যিনি কথাটি প্রথম পেড়েছিলেন, তাঁকে ওই সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন হিসেবেই গণ্য করা হয় এখনো। প্রভাবের কথাটা তোলার কারণ হলো, সে সময়কার অনেক উপদেষ্টাই এখন তাঁদের সরকারের নেওয়া কোনো কোনো অতিগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপেরও দায় নিতে রাজি হচ্ছেন না। তাঁরা বরং এসবের দায় চাপাতে চাইছেন এক অদৃশ্য ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর ওপর। মুহাম্মদ ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের একটি কিচেন ক্যাবিনেট থাকার বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আনেন সেই উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি বলেছিলেন, ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের একটা কিচেন ক্যাবিনেট ছিল। ওই ক্যাবিনেটের সদস্য তিনি ছিলেন না। সেখানে কী আলোচনা হতো, তাঁদের জানানো হতো না। সদস্যরা ছিলেন ইউনূসের নিকটজন। পরে মে মাসে আরেক সাবেক উপদেষ্টার মন্তব্যে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনার সময় সাত সদস্যের একটি অনানুষ্ঠানিক কিচেন ক্যাবিনেট সক্রিয় ছিল। তাঁরা সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন এবং প্রতি মঙ্গলবার যমুনা স্টেট গেস্টহাউসে তাঁদের বৈঠক হতো।

ইউনূসের কিচেন ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন, সে বিষয়ে কেউ স্পষ্টভাবে কিছু না বললেও ধারণা করা যায় যে তখনকার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ছিলেন সেই প্রভাবশালী চক্রের অন্যতম সদস্য। এই প্রভাবশালী উপদেষ্টা ২০২৫ সালের ৯ মে বলেছিলেন, জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করা হবে। বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে এক মতবিনিময় সভায় তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বলেছিলেন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো ঘৃণ্য অপরাধীরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। তাদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। তারা (অপরাধীরা) যে এ জাতির মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন, সেটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য হলেও ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন করতে হবে। অনন্তকাল হানাহানি করে এ জাতির মুক্তি হবে না বলে উল্লেখ করে তিনি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছিলেন। আসিফ নজরুল জানিয়েছিলেন, ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের বিষয়ে অভিজ্ঞতা নিতে ও বিস্তারিত জানতে একটি প্রতিনিধিদল দক্ষিণ আফ্রিকা যাবে।

বর্ণবাদের বিভাজন দূর করে সংহতি ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৫ সালে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সত্য উদ্‌ঘাটন, বিচার ও পুনর্মিলনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে দেশটিতে ওই কমিশন গঠন করা হয়েছিল সর্বজন শ্রদ্ধেয় আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুর নেতৃত্বে। সেই কমিশনের অনুসৃত প্রক্রিয়া ও বিধিবিধান সারা বিশ্বে আদর্শ ও অনুসরণযোগ্য বলে মান্যতা পেয়েছে। সেই বিবেচনা থেকেই নিশ্চয়ই তখনকার আইন উপদেষ্টা বলেছিলেন, তিনি এবং প্রধান বিচারপতিসহ একটি টিম দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করবেন। কিন্তু এরপরই আরও প্রভাবশালী কোনো মহলের হস্তক্ষেপে আশ্চর্য দ্রুততায় বিষয়টি চাপা দেওয়া হয়। সে নিয়ে আর কেউ মাথাও ঘামায়নি। অথচ এমন একটি পদক্ষেপের অভাব অন্য কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা যে সম্ভব নয়, সে বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত। তবে কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর একটি মন্তব্য শোনার পর থেকে ভাবনাটি আরও বেশি করে ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৬ জুন এক মতবিনিময় সভায় রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘প্রতিশোধের মানসিকতা’ থেকে সবাইকে বেরিয়ে এসে দেশের উন্নয়নে ইতিবাচক কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি জেলের মধ্য থেকে এসেছি, আমি শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়েছি, মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়েছি। আমাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করার জন্য এখনো এক্স-রে করলে হয়তো দেখা যাবে আমার পিঠের হাড্ডিটা এখনো বাঁকাভাবে একটু লেগে আছে।’ তারেক রহমান বলেন, ‘বাট আমি এখন যদি যারা এর জন্য দায়ী, আমি যদি সে জন্য কাউকে দায়ী করে বেড়াই, তবে আমার তো হাড্ডি জোড়া লাগবে না। আমি এখনো যেই পেইনটা মাঝে মাঝে অনুভব করি, আমার সেই পেইনটাও চলে যাবে না। সুতরাং ক্ষতি যা হয়ে গেছে, সেটা নিয়ে না ভেবে দেশের কল্যাণের কথা ভাবতে হবে।’ দেশের স্বার্থে ভালো-মন্দ ধরিয়ে দিয়ে সহযোগিতা করতে সাংবাদিকদের প্রতিও অনুরোধ রেখে তিনি বলেছেন, ‘শুধু সরকার একা পারবে না, আপনার সহযোগিতা আমার লাগবে। আপনার সহযোগিতা না পেলে আমি বুঝতে পারব না যে কাজটা ভালো হচ্ছে না খারাপ হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য থেকে উৎসাহ বোধ করছি এ কথা বলতে যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বলা সত্ত্বেও যে পদক্ষেপটি নেওয়া হয়নি, সেটি নেওয়ার সময় ও প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এমনটা ভাবতেও উৎসাহ জোগায় যে পতিত কর্তৃত্ববাদী সরকারের সময় বিএনপির সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করা হয়েছিল, সেসবের প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা থেকে বিএনপি বেরিয়ে আসতে চায়। এটা ঠিক যে আমাদের দেশের রাজনীতিকেরা অনেক ক্ষেত্রেই মুখে যা বলেন, কাজে তা করেন না। প্রধানমন্ত্রী নিছক বাহবা কুড়ানোর জন্য কথাগুলো বলেছেন—এমনটা বিশ্বাস করতে চাই না। পরিবর্তিত মানসিকতা নিয়ে এগোতে চাইলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের সমর্থনপুষ্ট একটি দলের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে দেখা দরকার। এটি শুধু আমার একার উপলব্ধি, তা কিন্তু নয়; বরং ‘আওয়ামী দুশমন’ হিসেবে পরিচিত কেউ কেউ বেশ আগেই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার তাগিদ দিয়েছেন।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারাও তো বিভিন্ন সময়ে বলে এসেছেন, কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে তাঁরা নন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার আমরা কারা। জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে।’ যদিও ছয় মাসের মাথায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হলে তাকে স্বাগতও জানিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের মে মাসে ওই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর সে বছরের সেপ্টেম্বরে আবার কেউ কেউ জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানালে সে প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড বা কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা বিএনপি সমর্থন করে না। যারা জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা চাচ্ছে, তাদের বক্তব্য যদি সত্য হয়, তাহলে তারা সেই অভিযোগটা আদালতে উত্থাপন করতে পারে। বিএনপির এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও একটি দলকে নিষিদ্ধ করে রাখার বিষয়টি খাপ খায় না।

এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রস্তাবে কেউ কেউ ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে তেড়ে আসবেন। তাতে কিন্তু সমস্যাটি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে না। তাঁরা হয়তো বলবেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তো এখনো উদ্ধত, সংস্কারহীন ও অনুশোচনাহীন মনোভাব দেখিয়ে চলেছে। জ্যেষ্ঠ নেতারা বিদেশে অবস্থান করে দেশে ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। জুলাই-আগস্টের দমন-পীড়নের পর দলটির কোনো জ্যেষ্ঠ নেতা দলের পক্ষ থেকে বা তখনকার সরকারের হয়ে এর দায়িত্ব স্বীকার করেননি কিংবা ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশও করেননি। দলটি এখনো পুরোনো নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণেই আছে। তারা আত্মসমালোচনা বা সংস্কারের কোনো অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেনি। এ ছাড়া দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই-আগস্টের ঘটনা নিয়ে অপতথ্যও ছড়ানো হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তো এসব অপতৎপরতা ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। বরং তাদের ঝটিকা মিছিলের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অর্থ কিন্তু অপরাধের বিচার বন্ধ করাও নয়। গুরুতর অপরাধের বিচার যেমন চলছে, তেমনটি চালু রেখেও সত্যানুসন্ধান কমিশনের মাধ্যমে যাঁরা গুরুতর অপরাধে জড়িত ছিলেন না, তাঁদের বিষয়টি সুরাহা করে সমাজে ও রাজনীতিতে পুনর্মিলনের পথ সুগম করা যায়। বিচারের পাশাপাশি পুনর্মিলন বা অন্তর্ভুক্তির পথে না এগোলে সমাজে ও রাজনীতিতে প্রতিহিংসাই বাড়বে শুধু।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বিভ্রান্তি ও একজন বিদেশি বীর প্রতীক

মানুষের কষ্ট কমানোর কার্যকর যন্ত্রগুলো এখনো দুর্বল: ড. সেলিম রায়হান

ত্যাগের অপর নাম বাবা

রাজপথের শৃঙ্খলা: জরুরি বিবেচনা

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা

রাষ্ট্র কি মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে না

স্মৃতিতে শফী আহমেদ

সাংস্কৃতিক শিক্ষার গুরুত্ব এবং মন্ত্রিসভার অসম্মতি

ট্রাম্পের শুল্ক কৌশল ধাক্কা খেলেও বাংলাদেশের ওপর চাপ কমেনি

ইরান ‍চুক্তি কি সত্যিই স্বস্তি দিতে পারবে