‘তেলাপোকা’ বা ‘আরশোলা’ শব্দটি শুনলেই মানুষের মধ্যে একধরনের সহজাত বিরক্তি কাজ করে। কেউ মুখ বিকৃত করেন, কেউ ঝাঁটা হাতে নেন, কেউ আবার কীটনাশকের কথা ভাবেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, পৃথিবীর ইতিহাসে তেলাপোকারা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সফল জীব। প্রায় ২০ কোটি বছর ধরে তারা পৃথিবীতে টিকে আছে। এই বিশ্ব ডাইনোসরের উত্থান-পতন দেখেছে, হিমযুগ পার করেছে, মহাদেশের পরিবর্তন লক্ষ করেছে। তুলনায় মানুষ পৃথিবীর ইতিহাসে একেবারেই নবাগত। হোমো সেপিয়েন্সের বয়স যেখানে আনুমানিক ৩ লাখ বছর, সেখানে তেলাপোকারা কোটি কোটি বছর ধরে টিকে থাকার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।
তবু মানুষের কাছে তারা ঘৃণার প্রতীক। কারণ, সম্ভবত তারা সুন্দর নয়, আকর্ষণীয় নয় এবং মানুষের কল্পনায় বীরত্বের কোনো স্থানও তাদের নেই। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান বলে, মানুষ প্রায়ই যাদের বুঝতে পারে না, যাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাদের অবজ্ঞা করতে শেখে। আর সেই অবজ্ঞার ইতিহাস কখনো কখনো অদ্ভুত রাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনে।
সম্প্রতি ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা তেলাপোকাদের নামে গড়ে ওঠা ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগ সেই বাস্তবতারই একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ। এটি হয়তো নিছক হাস্যরস, হয়তো রাজনৈতিক বিদ্রূপ, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি গভীর সামাজিক বার্তা। কারণ, এখানে ‘তেলাপোকা’ কোনো পতঙ্গ নয়; এটি একটি প্রতীক। অবহেলিত, বঞ্চিত, অদৃশ্য, বেকার এবং হতাশ মানুষের প্রতীক। আর এই জায়গাতেই বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে এর গভীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে গত এক দশকে উন্নয়ন নিয়ে অসংখ্য গল্প বলা হয়েছে। মেগা প্রকল্প, অবকাঠামো, প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর—এসব নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ভাষ্যে আশাবাদের অভাব নেই। কিন্তু একই সময়ে অসংখ্য তরুণ এমন এক বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করছে, যেখানে শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই, দক্ষতা অর্জনের পরও উপযুক্ত সুযোগ সীমিত, আর প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে অনেকে শেষ পর্যন্ত হতাশার সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হয়।
একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হন। এরপর শুরু হয় চাকরির প্রস্তুতি। একের পর এক পরীক্ষা, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, ফলাফল স্থগিত, মামলা, প্রশাসনিক জটিলতা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল সময়ের বড় অংশ চলে যায় অনিশ্চয়তার মধ্যে। অনেকেই শেষ পর্যন্ত চাকরি পান না। আবার যাঁরা পান, তাঁদের বড় একটি অংশ নিজের যোগ্যতা ও শিক্ষার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হন।
এই বাস্তবতায় ‘তেলাপোকা’ পরিচয়টি হঠাৎ করে খুব অচেনা মনে হয় না। কারণ, তেলাপোকারাও তো অন্ধকারে বেঁচে থাকে। তারা দৃশ্যমান নয়, কিন্তু বিলুপ্তও নয়। তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে না, কিন্তু তারা সমাজের প্রান্তে টিকে থাকে। বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণও যেন আজ সেই অবস্থায় রয়েছে—দৃশ্যমান নয়, কিন্তু অনুপস্থিতও নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই অদৃশ্য জনগোষ্ঠীকে নতুন এক ভাষা দিয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটক—সব জায়গায় তরুণদের ক্ষোভ, হতাশা, ব্যঙ্গ এবং প্রতিবাদ নতুন রূপে প্রকাশ পাচ্ছে। আগে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার জন্য সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা সংগঠনের প্রয়োজন হতো। এখন একটি মিম, একটি ভিডিও বা একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
এই পরিবর্তনকে অনেকেই তুচ্ছ করে দেখেন। কিন্তু আধুনিক রাজনীতির ইতিহাস বলছে, ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস এখন আর শুধু রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, বরং বয়ান বা আখ্যান নির্মাণের ক্ষমতা। মানুষ তখনই উদ্বিগ্ন হয়, যখন অন্য কেউ গল্প বলার ক্ষমতা অর্জন করে। এই কারণেই ব্যঙ্গ কখনো কখনো রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কারণ, ব্যঙ্গ সরাসরি আক্রমণ করে না; বরং এমন একটি আয়না তুলে ধরে, যেখানে সমাজ নিজের মুখ দেখতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশেও আমরা বারবার এই প্রবণতা দেখেছি। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, বিভিন্ন নাগরিক অধিকারভিত্তিক উদ্যোগ কিংবা সাম্প্রতিক নানা সামাজিক বিতর্ক—সব ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অনেক সময় বাস্তব আন্দোলনের আগে ডিজিটাল আন্দোলন এসেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন ক্ষোভ বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নিতে পারেনি। এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে—এই ডিজিটাল অসন্তোষ কি কেবল ক্ষণস্থায়ী প্রতিবাদ, নাকি এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক শক্তির বীজ?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা মিশ্র। আরব বসন্তের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে গণতন্ত্রের নতুন হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ইতিহাস একই সঙ্গে এটাও দেখিয়েছে যে ক্ষোভ আন্দোলন তৈরি করতে পারে, সরকারকে চাপে ফেলতে পারে, এমনকি ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাতেও পারে; কিন্তু স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে না। সেই জন্য প্রয়োজন সংগঠন, নেতৃত্ব, নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ আছে, প্রশ্ন আছে, ক্ষোভ আছে। কিন্তু সেই শক্তিকে কীভাবে গঠনমূলক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া যাবে, সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন-সংকট, শিক্ষার ক্রমবর্ধমান খরচ এবং আয়ের বৈষম্য তরুণদের হতাশাকে আরও গভীর করেছে। উন্নয়নের গল্প যতই বলা হোক, একজন সাধারণ তরুণের কাছে প্রশ্নটি অনেক সহজ: ‘আমি চাকরি কবে পাব?’ , ‘আমার জীবন কবে স্থিতিশীল হবে?’, ‘আমার পরিশ্রমের প্রতিফলন কোথায়?’ এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর প্রায়ই পাওয়া যায় না।
অর্থনীতিবিদেরা প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ঘাটতি কিংবা সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক নিয়ে আলোচনা করেন। এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু
যে তরুণ কয়েক বছর ধরে চাকরির জন্য অপেক্ষা করছে, তার কাছে পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানেই ‘তেলাপোকা’ প্রতীকটি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কারণ, এটি মূলত সেই মানুষদের গল্প, যারা মনে করে রাষ্ট্র তাদের দেখতে পায় না। যারা বিশ্বাস করে, তারা উন্নয়নের গল্পের চরিত্র নয়, বরং ফুটনোট। যারা অনুভব করে, তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হয় না, তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, দীর্ঘদিন অবহেলিত মানুষ একসময় নিজেদের জন্য নতুন পরিচয় তৈরি করে। যে পরিচয় একসময় অপমানের ছিল, সেটিই পরে গর্বের প্রতীকে পরিণত হয়। রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ অসংখ্য। তাই প্রশ্নটি আসলে তেলাপোকাদের নিয়ে নয়।
প্রশ্ন হলো, কেন এত মানুষ নিজেদের সেই পরিচয়ের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছে? কেন এত তরুণ মনে করছে তারা অদৃশ্য? কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ, হতাশা ও ক্ষোভ এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে? এর উত্তর খুঁজতে হলে কেবল রাজনীতি নয়, অর্থনীতি, শিক্ষা, সামাজিক গতিশীলতা এবং রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্কের দিকেও তাকাতে হবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। যত দিন বেকারত্ব থাকবে, যত দিন সুযোগ ও প্রত্যাশার মধ্যে ব্যবধান থাকবে, যত দিন তরুণদের একটি অংশ নিজেদের প্রান্তিক ও উপেক্ষিত মনে করবে, তত দিন ‘তেলাপোকা’ শুধু একটি পতঙ্গ থাকবে না। এটি একটি সামাজিক রূপক, একটি রাজনৈতিক প্রতীক এবং একধরনের নীরব প্রতিবাদের ভাষা হয়ে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত তেলাপোকারা হয়তো টিকে যাবে। প্রকৃতিতেও তারা টিকে থাকে, সমাজেও তাদের প্রতীকী উপস্থিতি টিকে থাকতে পারে। কিন্তু আসল প্রশ্ন তাদের টিকে থাকা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, এমন কী ঘটছে যে একটি সমাজের এত মানুষ নিজেদেরকে আলোয় দাঁড়ানো নাগরিকের চেয়ে অন্ধকারে বেঁচে থাকা তেলাপোকার সঙ্গে বেশি মিল খুঁজে পাচ্ছে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াই সম্ভবত আজকের বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজ। কারণ, ইতিহাস বলে, অবহেলিত কণ্ঠস্বরকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা যায়, কিন্তু চিরদিন গলা টিপে ধরে নীরব রাখা যায় না। একসময় তারা নতুন ভাষা খুঁজে নেয়, নতুন প্রতীক তৈরি করে, নতুন পরিচয়ে ফিরে আসে।
আর তখন আলোচনার বিষয় আর তেলাপোকা থাকে না; আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে সেই সমাজ, যে সমাজ তারই এক বড় অংশকে তেলাপোকা মনে করতে শিখিয়েছে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট