হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

কীভাবে একটি চুক্তি নতুন করে লিখে দিল জ্বালানিনির্ভরতা

শিয়ামাক আলী

গোড্ডা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রটি শুধু বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ সরবারহ করতে নির্মিত হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ—প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের বসবাস এখানে এবং দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গতিশীল উন্নয়ন-ধারার একটির মধ্য দিয়ে দেশটি এগোচ্ছে। এ ধরনের বিশাল জনগোষ্ঠীর বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ কোনো পার্শ্বিক চ্যালেঞ্জ নয়; এটি কাঠামোগত বাস্তবতা। বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বে ৩২তম হলেও এই অবস্থান বাস্তব চিত্রের চেয়ে আড়ালই বেশি করে। কারণ, ২০০০ সালের পর থেকে দেশে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় ৫৫০ শতাংশ বেড়েছে—চাহিদা ও শিল্পায়নের এমন লাফ বিশ্বে প্রায় নজিরবিহীন।

এই উল্লম্ফন কোনো ইতিহাসের পাদটীকা নয়। এটি এমন এক দেশের প্রতিচ্ছবি, যে দেশ এখনো অর্থনৈতিক উত্থানের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে—জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, আর বৈশ্বিক উন্নয়ন-সোপানে ওঠার জায়গাও বিপুল। স্থবির হওয়ার বদলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা আরও দ্রুত বাড়ারই কথা—অতিরিক্ত ভোগের কারণে নয়, বরং মৌলিক প্রয়োজনের তাগিদে। নগরায়ণ বাড়ছে, কারখানা বিস্তার লাভ করছে, আর বিদ্যুৎ গ্রিড হিমশিম খাচ্ছে সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাল মেলাতে, যা বিদ্যমান সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

উন্নয়ন-আকাঙ্ক্ষা যখন কাঠামোগত সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন বাংলাদেশ—অন্যান্য উন্নয়নশীল অর্থনীতির মতোই—বিশ্বায়নের সুফলের দিকে তাকিয়েছে, বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতসহ আন্তসীমান্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে। কিন্তু যেখানে এসব ব্যবস্থায় অসমতা নিহিত থাকে, সেখানে বিদ্যুৎ-বাণিজ্য অংশীদারত্ব খুব কম ক্ষেত্রেই মূল্যহীন হয়। এগুলো প্রায়ই দ্বিমুখী অস্ত্রের মতো কাজ করে—স্বল্প মেয়াদে চাপ কমালেও দীর্ঘ মেয়াদে এমন নির্ভরতা গেঁথে দেয়, যেগুলো থেকে বেরিয়ে আসা অনেক কঠিন।

শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ ক্রমেই ভারতের কাছ থেকে আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে—নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি সরকারের সময়ে—যা দুই দেশের দীর্ঘদিনের মিত্রতার প্রেক্ষাপটে ‘বাস্তববাদী আঞ্চলিক সহযোগিতা’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে সমালোচকেরা বরাবরই সতর্ক করে আসছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তসীমান্ত গ্রিডনির্ভরতা সাধারণত ভারসাম্য আনার বদলে অসমতাই তীব্র করে। এই কাঠামোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাঠামোগত গুরুত্ব পেয়েছে ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় আদানি গ্রুপের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ।

২০২৩ সালে চালু হওয়া ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গোড্ডা আল্ট্রা সুপার-ক্রিটিক্যাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ভারতের প্রথম আন্তদেশীয় বিদ্যুৎ প্রকল্প, যেখানে উৎপাদিত বিদ্যুতের শতভাগই অন্য দেশে সরবরাহ করা হয়। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির আওতায় আদানি পাওয়ার ঝাড়খন্ড লিমিটেড বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে বাধ্য, বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি নির্দিষ্ট ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে। এর অর্থ, বাংলাদেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ১০ শতাংশই আদানি গ্রুপ সরবরাহ করছে।

তবে গোড্ডা ব্যবস্থার নির্ধারক বৈশিষ্ট্য কেবল এর আকার নয়; এর অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীভবন একে কাঠামোগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্রমেই বিতর্কিত করে তুলেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ভারতের ভেতরে, বাংলাদেশের বিচারিক সীমার সম্পূর্ণ বাইরে অবস্থিত। এর পরিচালনা নির্ভর করে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপর, যার বাস্তবায়ন শেষ পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্থিতিশীলতার ওপরই নির্ভরশীল। এমন এক অঞ্চলে, যেখানে রাজনৈতিক সমীকরণ খুব কমই স্থির থাকে—এটি তুচ্ছ ঝুঁকি নয়; বরং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি।

প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বেসরকারি সরবরাহকারীর সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন হিসেবে গঠিত হলেও, ভারতের প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী ও বিজেপির ঘনিষ্ঠতার কারণে করপোরেট স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজনের সুযোগ খুব কম। ফলে বাংলাদেশের নির্ভরতা কেবল আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর নয়; বরং দেশের বাইরে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের ধারাবাহিক সামঞ্জস্যের ওপরও।

বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি ঘিরে বিতর্ক কেবল আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ধারণাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আরও একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো—যে শর্তে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সরকারি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, এসব শর্তে ব্যয় ও ঝুঁকির অসামঞ্জস্যপূর্ণ অংশ ক্রেতার ঘাড়ে চাপানো হয়েছে।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও আদানি পাওয়ার ঝাড়খন্ড লিমিটেডের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমন একটি ট্যারিফে বিদ্যুৎ কিনতে সম্মত হয়েছে, যা অন্য ভারতীয় সরবরাহকারীদের তুলনায় স্পষ্টতই বেশি। রয়টার্সের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ আদানিকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য গড়ে ১৪ দশমিক ৮৭ টাকা দিয়েছে, যেখানে অন্য ভারতীয় উৎপাদকদের কাছ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম ছিল প্রতি ইউনিট ৯ দশমিক ৫৭ টাকা। পরে সরকার-নিযুক্ত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি জানায়, আদানি চুক্তিতে তুলনাযোগ্য বেসরকারি খাতের চুক্তির তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ মূল্যের প্রিমিয়াম রয়েছে। কমিটি কয়লার দাম নির্ধারণের পদ্ধতি, কর স্থানান্তরের বিধান এবং এমন সব চুক্তিগত সুরক্ষার কথা উল্লেখ করে, যা সরবরাহকারীকে সুরক্ষা দিলেও বাজার পরিস্থিতি বদলালে বাংলাদেশের ব্যয় পুনর্নির্ধারণের সক্ষমতা সীমিত করে।

আদানিকে দেওয়া ট্যারিফ বেশি হওয়ার কারণ হলো, এই চুক্তি বাজার-সংযুক্ত নয়। এটি একটি প্রকল্পভিত্তিক, দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়ব্যবস্থা, যার লক্ষ্য চুক্তির মেয়াদকালে মূলধনী ব্যয়, পরিচালন ব্যয়, করঝুঁকি ও মুদ্রাঝুঁকি পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা।

গোড্ডা কেন্দ্রটি একমাত্র বাংলাদেশের জন্য নির্মিত হওয়ায়, এই লেনদেন ভারতের বিদ্যমান বিদ্যুৎবাজার থেকে আসে না; বরং তার বাইরে পরিচালিত হয়। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাজার-সংযোগ না থাকলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, নিয়ন্ত্রক তুলনামূলক মূল্যায়ন ও এক্সচেঞ্জভিত্তিক মূল্য আবিষ্কারের মতো স্বাভাবিক মূল্যশৃঙ্খলা কার্যত অনুপস্থিত থাকে।

আওয়ামী লীগ ও বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর অনুমোদনের ছায়ায় প্রকল্পটি নিজস্ব ব্যয়-পুনরুদ্ধারের মানদণ্ড নির্ধারণ করতে পেরেছে। ফলে যেটিকে বিদ্যুৎ-বাণিজ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বাস্তবে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতায় গড়া স্বজনপুঁজিবাদী প্রকল্প অর্থায়নে রূপ নিয়েছে; যেখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে রাজনৈতিক সান্নিধ্যই বেশি প্রভাবশালী।

সব মিলিয়ে গোড্ডা ব্যবস্থা দেখায়—তুষ্টি, অসমতা ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদ কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত ক্ষতিতে পরিণত হতে পারে। যাকে বাস্তববাদী সহযোগিতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বেসলোড বিদ্যুতের একটি বড় অংশকে একক বহিরাগত প্রকল্পের সঙ্গে বেঁধে দিয়েছে—ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী, চুক্তিগতভাবে কঠোর এবং সেই মূল্যশৃঙ্খলার বাইরে, যা সাধারণত জনস্বার্থকে সুরক্ষা দেয়।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা একক নয়। শ্রীলঙ্কায় আদানি-সমর্থিত মান্নার বায়ুশক্তি প্রকল্প স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী ও নাগরিক সমাজের টানা প্রতিবাদের মুখে পড়ে—অস্বচ্ছ অনুমোদন, পরিবেশঝুঁকি ও জীবিকায় হুমকির অভিযোগে। আইনি চ্যালেঞ্জে জোরদার হওয়া এসব আন্দোলনের ফলে নতুন প্রশাসনের অধীনে প্রকল্পটি নতুন করে পর্যালোচনায় যায় এবং শেষ পর্যন্ত আদানি সরে দাঁড়ায়। কেনিয়ায়ও আদানি-সম্পর্কিত বড় বিমানবন্দর ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্প জনবিক্ষোভ ও শ্রমিক প্রতিরোধের মুখে বাতিল হয়। উভয় ক্ষেত্রেই, জনবিরোধিতা যখন রাজনৈতিক সুরক্ষার দেয়াল ভেঙেছে, তখন চুক্তিগুলো টেকসই থাকেনি।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চুক্তি বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো অনিবার্যতা ছিল না; এটি ছিল হাসিনা সরকারের অগ্রাধিকার থেকে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত। আদানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে গিয়ে সরকার গতি, দৃশ্যমানতা ও রাজনৈতিক সামঞ্জস্যকে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতার ওপর প্রাধান্য দিয়েছে। সেই সিদ্ধান্তের মূল্য এখন ২৫ বছরের একটি চুক্তিতে গেঁথে গেছে—যার ঝুঁকি বহন করছেন না নীতিনির্ধারক বা চুক্তিপক্ষ, বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ।

বিদ্যুৎ প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু তা এমন শর্তে, যেখানে ভারসাম্যপূর্ণ বিনিময়ের বদলে কেন্দ্রীভূত প্রভাবই প্রতিফলিত এবং যে চুক্তি স্বাক্ষরকারী সরকারের মেয়াদ পেরিয়ে টিকে থাকবে, তার আর্থিক ও কাঠামোগত পরিণতি শেষ পর্যন্ত বহন করবে সাধারণ বাংলাদেশিরাই।

(লেখক অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি বিষয়ক একটি চীনা থিঙ্ক ট্যাংকে কাজ করেন।)

ভোটের ডামাডোলে চাপা বন্দর রক্ষা

‘না’ বিজয়ী হলে রাষ্ট্রকে গণতন্ত্রায়ণ করার সুযোগ হাতছাড়া হবে: আলী রীয়াজ

সুষ্ঠু নির্বাচনের জনপ্রত্যাশা পূরণ হবে তো

ডিএনসিসির বাড়িভাড়া নির্দেশনা: মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

নির্বাচনের জন্য সবাই প্রস্তুত, তবু কেন সংশয় জনমনে

ভাষার জন্য বিশ্বের যত আন্দোলন

পরিবেশ রক্ষার রাজনীতি ও দায়বদ্ধতা

আলোকিত পৃথিবীর অন্ধকার দিক

নব্য-বাস্তববাদের আলোকে চির অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথ

ইরানে মার্কিন হামলার প্রভাব