হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

প্রিয় ঢাকা শহরকে বাঁচাতে হবে

মামুনুর রশীদ

মসজিদের শহর বলে পরিচিত ঢাকা এখন দোকানপাটের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

সভ্যতার কোনো এক আদি পর্ব থেকে মানুষের আবাস ও ভূমির স্বপ্ন জাগরিত হয়েছিল, তা সঠিকভাবে বলা কঠিন। তবে বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ থেকে অনুমান করা যায়, আদিকাল থেকেই উন্নত আবাসভূমির চিন্তা মানুষকে ধাবিত করেছে। আমাদের এই উপমহাদেশেই মহেঞ্জদারো, হরপ্পা, নালন্দা, মহাস্থানগড়—এসব থেকেই বোঝা যায়, কত উন্নত পুরকৌশল এবং স্থাপত্যবিদ্যার বিকাশ ঘটেছিল। এ কথাও সত্যি, ঔপনিবেশিক শাসনামলে শাসকদের স্থাপত্যচিন্তাও শহর নির্মাণকে প্রভাবিত করেছে। ১৬১০ সালে ঢাকায় যখন সুবে বাংলার রাজধানী স্থানান্তরিত হয়, তখন থেকেই মোগল স্থাপত্য এ শহরে নির্মাণ শুরু হয়। তখনকার সেই সব সুরম্য অট্টালিকা এখন আর দেখা যায় না। এরপর ব্রিটিশ শাসনের সময়কার কিছু কিছু অবশেষ থাকলেও তা অতি নগণ্য।

আর্মেনিয়ানরা ঢাকায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা থেকে শুরু করে, শহরের অভ্যন্তরে পানি নিষ্কাশনের জন্য ধোলাই খাল খনন করেছিল। সে খালটিও ভুল প্রযুক্তির কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। একমাত্র লালবাগ কেল্লার কিছু অংশ এখনো মোগল শাসকদের ইতিহাস বহন করে চলছে। পৃথিবীর উন্নত দেশ বড় শহরগুলোতে তাদের অতীত ঐতিহ্যকে এখনো সংরক্ষণ করে চলছে। কলকাতা, দিল্লি, প্যারিস, লন্ডন, রোম—এসব শহর তাদের অতীত ঐতিহ্যকে রক্ষা করছে। কিন্তু ঢাকা শহর এ ব্যাপারে ভীষণ কৃপণ। সে কিছুতেই অতীতকে ধারণ করতে চায় না। ঢাকা শহরের বয়স ৫০০ বছর হলেও এর ইতিহাস কাগজে লিপিবদ্ধ আছে, কিন্তু সেসব অবকাঠামোর চিহ্ন এখন আর চোখে পড়ে না। যেখানে গত ১০০ বছরের স্মৃতিচিহ্ন রক্ষা করা হয়নি। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে গুলিস্তানকে কেন্দ্র করে নতুন ঢাকার একটা কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল; তা-ও আজকে ধ্বংসপ্রাপ্ত। বুড়িগঙ্গার ওপারে জিঞ্জিরার যে প্রাসাদটি, তা-ও এখন অনাদরে-অবহেলায় প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত।

ঢাকায় পৌরসভার ৪১৬ বছরের ইতিহাস নিয়ে এবারে একটি আয়োজনের চেষ্টা চলছে। ঢাকার পৌরসভা, পঞ্চায়েতপ্রধান এবং সরদারদের ইতিহাস যতটুকু জানা যায়, সেটাও সেভাবে এখন আর জানার সুযোগ নেই। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকানপাট। আবাসভূমি এবং দোকানপাটের মধ্যে কোনো বিভাজন থাকছে না। একদা মসজিদের শহর বলে পরিচিত ঢাকা নগরী এখন দোকানপাটের নগরীতে পরিণত হয়েছে। মানুষের চলাচলের জন্য যে রাজপথ প্রয়োজন, তা-ও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ঢাকা নগরীর অনুকরণে দেশের সব ছোট-বড় শহরেও দোকানপাটের প্রচুর আধিক্য দৃষ্টিনন্দন মফস্বল শহরগুলোকে ধ্বংস করে ফেলেছে। অপ্রশস্ত পথগুলো এখন দখল করে আছে নানা ধরনের যানবাহন। বিশেষ করে অটোরিকশা শহরগুলোকে জঞ্জালে পরিণত করেছে। শহরের নির্মাণকাজের জন্য যে কর্তৃপক্ষ, তারা দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। এসব কর্তৃপক্ষ ছাড়াও একটা বড় দায়িত্ব ছিল শহরের নাগরিকদের। কিন্তু সেই নাগরিকেরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে কখনোই সচেতন ছিলেন না। অনেক দেশের বড় বড় শহরে দেখেছি, নাগরিকেরা সেখানকার জলাশয়, প্রাচীন অট্টালিকা, প্রশস্ত রাজপথ, পার্ক, খেলার মাঠ, প্রাচীন বৃক্ষ—এসব রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। আধুনিককালে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় রয়েছে পরিবেশ রক্ষার জন্য। এই মন্ত্রণালয় আমাদের দেশে একেবারেই অবহেলিত এবং নাগরিকদের সঙ্গে নিয়ে কোনো ধরনের পরিবেশ রক্ষার কাজে যুক্ত হতে দেখা যায় না। ফলে ঢাকা শহর একটি কংক্রিট ও দোকানের জঞ্জালে পরিণত হয়েছে।

অতীতে ঢাকা শহরের বিদ্যালয়গুলোর সামনে বিশাল বিশাল খেলার মাঠ ছিল। আজ থেকে ১০০ বছর আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যে ক্যাম্পাস গড়ে উঠেছিল, তা-ও বেশ বড় এবং সুপরিকল্পিত ছিল। এখন নতুন কোনো স্কুল নির্মাণের সময় খেলার মাঠের কথা ভাবাই হয় না। আর সবচেয়ে কষ্টকর অভিজ্ঞতা হয় মাদ্রাসাগুলোকে দেখলে। খেলার মাঠ বা একটু সুপরিসর স্থান তো দূরের কথা, একটা ফ্ল্যাট অথবা কোনো সংকীর্ণ স্থানেও গড়ে উঠছে মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসাগুলোর অনুমোদনের জন্যও কর্তৃপক্ষকে কোনো কষ্ট করতে হয় না। অবলীলায় তারা সরকারের অনুমোদন পেয়ে যায়। একসময়কার সুপরিকল্পিত আবাসস্থল ধানমন্ডি এখন স্কুল, হাসপাতাল, ক্লিনিক, রেস্তোরাঁ ও বিপণিবিতানে পরিপূর্ণ। আইনগত লড়াইয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে রায় পেয়েও এই অননুমোদিত বিদ্যালয় বা ক্লিনিকগুলোকে অপসারণ করা যাচ্ছে না।

যেকোনো সরকার ক্ষমতায় এসেই তারা যেমন সবকিছুর কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়, ঠিক তেমনি নগরবাসীর আকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করার চেষ্টাই করা হয় না। এত নির্বাচিত কাউন্সিলার এবং কর্মচারী থাকার পরেও শহরের উন্নয়ন কর্মসূচিতে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার কোনো চেষ্টাই করা হয় না। ফলে নাগরিকেরা এই শহরকে শুধু একটি জীবিকাশ্রয়ী শহর হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। যে পরিমাণে পৌরকর নাগরিকদের কাছ থেকে আদায় করা হয়, তার কোনো জবাবদিহি করতেও দেখা যায় না। অথচ পঞ্চায়েত প্রথার মধ্যে মহল্লাবাসীদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ৬০-৭০ বছর আগেও ঢাকার সরদারদের শহর উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। জানা গেছে, দেশের বড় শহরগুলোতে মেট্রোপলিটন সরকারের মতো প্রাচীন সিটি স্টেট আদলে একটা কিছু গড়ে তোলা হবে। এর জন্য যথার্থ অবকাঠামো রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা একটি মন্ত্রণালয়ের অধীন পৌরসভাই রয়ে গেছে। বর্তমান সিটি করপোরেশনগুলোকে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় ক্ষমতার অভাবে অন্য সংস্থাগুলো সিটি করপোরেশনকে সেভাবে গুরুত্ব দেয় না। বড় শহরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সিটি করপোরেশনের অধীনে থাকে। ফলে করপোরেশনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা অনেক গুণে ফলপ্রসূ দেখা যায়। একটা বিষয়ে সরকারকেও নাগরিকদের নিয়ে কোনো জনকল্যাণমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এই শহরটিকে যারা ব্যবহার করে তাদের মতামত, ভাবনা অবশ্যই রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে একটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ভেতর ঢুকে গিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও খুব একটা সুবিধা করতে পারেন না, বরং দেখা যায় ক্ষমতার পালাবদলের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নানা ধরনের অসদাচরণের কারণে শাস্তি পেয়ে থাকেন। কিন্তু যাদের পরামর্শে কাজগুলো হয়েছে, তাদের গায়ে একটুও বাতাস লাগে না।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে গ্রামগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠী শহরের দিকে ধাবিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা সব ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ ঝাঁকে ঝাঁকে এই শহরে আসতে থাকে এবং অপরিকল্পিতভাবে আবাসভূমি গড়ে তুলছে। একবার যারা এই শহরে আসে তারা আর কোনো দিন গ্রামে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার কথা ভাবে না। তবে ঈদে বা অন্যান্য উৎসবে বিপুল নগরবাসীকে গ্রামে যেতে দেখা যায় এবং উৎসব শেষেই তারা আবার এ শহরে ফিরে আসে। ফলে প্রতিদিনই এই শহরের জনসংখ্যা বাড়ছেই। সেই সঙ্গে বিপুল বিপণিবিতান, হাসপাতাল ও স্কুল বাড়ছে, কোনো সুস্থ অবকাঠামো ছাড়াই।

আগেই বলেছি, এ শহরে যারা বসবাস করে তারা শহরটাকে জীবিকাশ্রয়ী বলেই মনে করে। সুদীর্ঘকাল বসবাসের জন্য যে সুস্থ অবকাঠামো বা পরিবেশ প্রয়োজন, সেটার কথা একসময় ভুলেই যায়। আর এরই মধ্যে শহর সম্প্রসারণের বিকল্প হিসেবে জনগোষ্ঠীর বসবাসের জন্য বহুতল অট্টালিকা গড়ে উঠছে, যাতে শহরের দিগন্তটাই হারিয়ে যায়। এই অপরিকল্পিত নগরায়ণ মানুষকে অস্থির করে তুলছে। একদিকে নাগরিকদের যাতায়াতের জন্য কোনো ধরনের সুপরিকল্পিত গণপরিবহনব্যবস্থা নেই, অন্যদিকে আছে ব্যক্তিমালিকানাধীন অসংখ্য বিলাসবহুল গাড়ি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাজার হাজার অটোরিকশা। রাজধানী শহরে কোনো ধরনের আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়াই এসব অটোরিকশার চলাচল প্রতিদিনই যানজটের সৃষ্টি করছে। এসবের ওপর সিটি করপোরেশনের কোনো কর্তৃত্বও নেই।

৫০০ বছরের এই ঐতিহ্যমণ্ডিত নগরী, যার পৌরসভার বয়স হয়েছে ৪১৬ বছর; সেইখানে এই অব্যবস্থাপনা ৩ কোটি ৬৬ লাখের (জাতিসংঘের ফেব্রুয়ারি ২০২৬, তথ্য অনুযায়ী) বেশি মানুষের জীবনযাপনকে একটা অসুস্থ প্রবণতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটা দুঃখজনক। এখনই যদি কোনো বাস্তবভিত্তিক শৈল্পিক পরিকল্পনার মধ্যে শহরকে আনা না যায়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে যাবে।

মামুনুর রশীদ, নাট্যব্যক্তিত্ব

বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদের অপার সম্ভাবনা

সরলতার মহিমা ও সমাজের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা

পুতিন কি মৃত্যুকে জয় করতে পারবেন

জর্ডানপ্রবাসীদের কষ্টের কথা কেউ জানে না

শিক্ষার করুণ দশা কি চলতে থাকবে

হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আর কত দিন

এই মৃত্যুর দায় কার

গণ-আন্দোলন, নাকি মেটিকুলাস ডিজাইন

সৌন্দর্য চিকিৎসায় গড়ে উঠছে নতুন অর্থনীতি

সার্জিও গরের সফর প্রশ্ন, কূটনীতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা