বিশ্ব পরিবেশ দিবস
পরিবেশ নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল ১৯৭২ সালে স্টকহোমে। এ সময়ই শিল্পায়নের দ্রুত বিস্তার আর প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয় বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল। সেই ভাবনা থেকে মানব পরিবেশ সম্মেলন পরিবেশ সুরক্ষার বৈশ্বিক ভিত্তি নির্মাণ করে। পরের বছরই ১৯৭৩ সালের ৫ জুন ‘একমাত্র পৃথিবী’ স্লোগানে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের যাত্রা শুরু হয়। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দিবসটি পৃথিবীর বৃহত্তম পরিবেশ সচেতনতা কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে সরকার, গবেষক, পরিবেশবিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ অংশ নেয়।
এ বছর পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ইন্সপায়ার্ড বাই নেচার। ফর ক্লাইমেট। ফর আওয়ার ফিউচার’। অর্থাৎ ‘প্রকৃতির অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’
মানবসভ্যতার ইতিহাসে আমরা এমন একটি সময়ের মধ্যে আছি যেখানে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা আর উদ্বেগ কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর মেরুর বরফ গলা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে অস্তিত্বের লড়াই, আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খরার কবল আর এশিয়ার শহরগুলো তাপপ্রবাহ ও দূষণের নতুন রেকর্ড গড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি এবং দূষণের এই ত্রিমুখী সংকটকে জাতিসংঘ ইতিমধ্যে মানবজাতির অস্তিত্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) ২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবস ‘নাও ফর ক্লাইমেট’ স্লোগানের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। বাংলাদেশ তার অন্যতম উদাহরণ। বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ১ শতাংশের কম; অথচ ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক বন্যা এবং তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে এ দেশের মানুষকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। একই চিত্র রয়েছে এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও। হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েক শ কোটি মানুষ ভবিষ্যতে পানির নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়বে। ভারত, পাকিস্তান ও চীনের বিভিন্ন অঞ্চলসহ ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দ্বীপরাষ্ট্রগুলোও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সরাসরি হুমকির মুখে রয়েছে।
পরিবেশদূষণের কারণ নিয়ে আলোচনায় কিছু বিষয় অতিরিক্ত গুরুত্ব পায় আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংকট আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অনেকেই মনে করে, প্লাস্টিক দূষণই পরিবেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বাস্তবে এটি সংকটের একটি অংশমাত্র। বায়ুদূষণ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম নীরব ঘাতক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দূষিত বায়ুর কারণে প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। ঢাকাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু শহর প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর তালিকায় স্থান পায়। একই সঙ্গে শব্দদূষণ, ইলেকট্রনিক বর্জ্য, শিল্পবর্জ্য, নদী দখল, বন উজাড় এবং অতিভোগবাদী জীবনযাত্রা পরিবেশের ওপর সমানভাবে চাপ সৃষ্টি করে।
আরেকটি কম আলোচিত কিন্তু ভয়াবহ সংকট হলো জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে পৃথিবী বর্তমানে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির যুগে প্রবেশ করেছে। আগের পাঁচটি গণবিলুপ্তি প্রাকৃতিক কারণে ঘটলেও ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির প্রধান কারণ মানব কার্যকলাপ। প্রতিবছর হাজার হাজার প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে, যাদের নাম পর্যন্ত মানুষ জানার সুযোগ পায় না। অথচ প্রতিটি প্রজাতি পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুই শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
মানুষ যেমন পরিবেশসংকটের অন্যতম কারণ, তেমনি মানুষই এর সবচেয়ে বড় সমাধান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ নগর পরিকল্পনা, বন পুনরুদ্ধার কর্মসূচি এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ ইতিমধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম পরিবেশ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং বিজ্ঞান নতুন নতুন সমাধান খুঁজে বের করছে। তবে প্রযুক্তি একা এই সংকট সমাধান করতে পারবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দায়িত্বশীল নীতি, টেকসই উন্নয়ন এবং ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতন জীবনযাপন।
অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমানো, ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন, জ্বালানি সাশ্রয়, বৃক্ষরোপণ এবং স্থানীয় পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্যোগে অংশগ্রহণ ছোট পদক্ষেপ মনে হলেও সম্মিলিতভাবে এগুলো বড় পরিবর্তনের শক্তি।
শুধু পরিবেশ দিবসে পরিবেশ নিয়ে স্লোগান, ওয়ার্কশপ কিংবা সেমিনার না করে আমাদের উচিত প্রতিদিন নিজেদের যত্নের পাশাপাশি পরিবেশের যত্ন নেওয়া। পৃথিবী আজ মানুষের কাছে বড় কোনো প্রতিশ্রুতি চায় না। চায় শুধু দায়িত্বশীল কিছু সিদ্ধান্ত, যা উন্নয়নকে প্রকৃতির প্রতিপক্ষ না করে সহযাত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। কারণ মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি প্রজন্ম এমন অবস্থানে আছে, যারা একই সঙ্গে পৃথিবীকে ধ্বংস করতে পারে, আবার রক্ষাও করতে পারে।