হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ইতিহাসে ৭ নভেম্বরকে ফিরে দেখা

ড. মারুফ মল্লিক

ড. মারুফ মল্লিক

দেশের রাজনীতির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হচ্ছে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস দেশের রাজনীতির দিক পরিবর্তন করেছিল। শুরু হয়েছিল একভাবে আর শেষ হয়েছিল আরেকভাবে। নভেম্বরের ৩ তারিখ খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে করা হয় গৃহবন্দী। কার্যত ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কোনো সরকার ছিল না বা সরকারের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। এই পরিস্থিতিতে জাসদের নেতা-কর্মীরা কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নেয়। তবে এক্ষেত্রে খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহেরের মূল সংকট ছিল অভ্যুত্থান সংঘটনের জন্য সামরিক বাহিনী ও জনসাধারণের মধ্যে যে ধরনের সমর্থন ও সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল, তা তাঁদের ছিল না।

প্রথমত, খালেদ মোশাররফ সামরিক বাহিনীর স্বল্প কিছু অফিসার ছাড়া আর কারও সমর্থন পাননি। খালেদ মোশাররফ থেকে জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীতে অধিক জনপ্রিয় ছিলেন। ফলে কর্নেল তাহের খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থানের সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করেন। কিন্তু দল হিসেবে জাসদ সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও খুব বেশি শক্তিশালী ছিল না। ফলে কর্নেল তাহের জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে খালেদ মোশাররফকে প্রতিহত করার উদ্যোগ নেন।

৩ নভেম্বরের পর যখন মূলত খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহেরের ক্ষমতা দখলের লড়াই শুরু হয়, তখন জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী। স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করার সংবাদ শুনে সামরিক বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ মানুষ বিচলিত হয়ে ওঠে এবং সারা দেশে এক উৎকণ্ঠাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ফলে তাঁরা কেউই সফল হতে পারেননি।

যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম শর্ত হচ্ছে, জনমত ও জনবলকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসা। কিন্তু ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে জাসদের অভ্যুত্থান সংঘটনের মতো যথেষ্ট শক্তি ও জনবল ছিল না। তাই ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থান জাসদের রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। এর পরেই জাসদের রাজনৈতিক সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। ওই সময়ের জাসদ কর্মীদের আলাপ থেকে জানা যায়, কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তে জাসদ এই অভ্যুত্থানে জড়িত হয়নি। বরং কর্নেল তাহেরের একক সিদ্ধান্তেই নভেম্বরের ঘটনা পরিক্রমায় জড়িয়ে যায় জাসদ। তবে কর্নেল তাহেরের সঙ্গে জাসদের গুটি কয়েক নেতা ছিলেন।

মহিউদ্দিন আহমেদ তাঁর ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘৭ নভেম্বর সকালে কর্নেল তাহের ও হাসানুল হক ইনু সেনানিবাসে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কথা বলতে যান। ওই সময় জিয়া জাসদের মূল নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলতে চান। কিন্তু সিরাজুল আলম খান নিরুদ্দেশ ছিলেন। তার এই অদৃশ্য হওয়া থেকে ধারণা করা হয় সিরাজুল আলম খান তাহেরের সাফল্য নিয়ে সন্দিহান ছিলেন এবং এই প্রক্রিয়ায় নিজেকে জড়াতে চাননি। এভাবেই কর্নেল তাহেরের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের মূল্য চুকাতে গিয়ে জাসদের রাজনীতির শেষের ধাপ শুরু হয়ে যায়, ঠিকমত বিকশিত হওয়ার আগেই।’

সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে জাসদের পক্ষ থেকে যোগাযোগটা রক্ষা করতেন মেজর জলিল। কিন্তু মেজর জলিল জেলবন্দী হলে কর্নেল তাহের এই দায়িত্ব লাভ করেন। তখন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে চরম মাত্রায় অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছিল। এই সুযোগে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অনুকরণে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নাম দিয়ে একধরনের গণবাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করেন কর্নেল তাহের। ১৯৭৫-এর নভেম্বর মাসে ওই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও বিপ্লবী গণবাহিনীকে ব্যবহার করে পাল্টা অভ্যুত্থান করেন। কিন্তু কর্নেল তাহেরের হিসাবে বড় ধরনের ভুল ছিল। সামরিক বাহিনীতে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা এবং সেনাবাহিনীর অন্যান্য কর্মকর্তার অবস্থান সম্পর্কে সম্ভবত তাঁর পরিষ্কার ধারণা বা তথ্য ছিল না। সেনাদের ওপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও ছিল না। খালেদ মোশাররফও একই ভুল করেছিলেন। সেনাবাহিনীর অবস্থান ও জিয়ার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সম্ভবত তিনিও ভুল হিসাব করেছিলেন। যে কারণে দুইজনই ৭ নভেম্বরে ঘটনার আড়ালে চলে যান। খালেদ মোশাররফ নির্মমভাবে নিহত হন এবং কর্নেল তাহের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে ছিটকে পড়ে যান।

বরং ৭ নভেম্বর সামরিক বাহিনীর সদস্যরা জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেন। যাঁরা জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেন, তাঁরাই তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। জাসদের একার পক্ষে জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করা মোটেই সম্ভব ছিল না। যদিও জাসদ দাবি করে তারাই জিয়াকে উদ্ধার করেছে। জাসদের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বরং জিয়ার জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে জাসদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ নিয়েছিল। কিন্তু সৈনিক সংস্থা কর্তৃক সামরিক বাহিনীর অফিসার হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত কর্নেল তাহের বা জাসদ ওই সময়ের ঘটনা প্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে। একধরনের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। বরং সামরিক বাহিনী ও জনসাধারণের সম্মিলিত উদ্যোগের কারণে জাসদেরও ক্ষমতা দখলের উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

জিয়াউর রহমানের সমর্থনে সামরিক বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ মানুষ পথে নেমে এসেছিল। জিয়া রণাঙ্গনে লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ভাগ্য সাহসীদের সঙ্গে থাকে। জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের অমিত সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের একজন। মূলত এসব কারণে জিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের একধরনের আস্থা ছিল। এই আস্থাই ১৯৭৫-এর নভেম্বরে জিয়াকে বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত করে ক্ষমতার দিকে নিয়ে আসে।

এরপর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে আমূল বদলে দিলেন দেশকে। নানা ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান তিনি। ১৯৭১ সালে যে স্বপ্ন ধারণ করে স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশের সূর্যসন্তানরা তা বাস্তবায়িত হতে শুরু করে। একদলীয় শাসন থেকে মুক্ত হয়ে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়। অর্থনীতি গতি ফিরে পায়। দেশের মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে শুরু করে। স্বাধীনতা অর্জনের পর আওয়ামী লীগ ও একদলীয় বাকশালের শাসনের পর দেশে প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বাদ নিয়ে আসে ৭ নভেম্বর।

ড. মারুফ মল্লিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠার দিন

পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষ: সরকারের দায়িত্ব সমন্বয়ের পথ বের করা

প্রবাসী নারী শ্রমিকের জীবন

গ্লোবাল সাউথের উত্থানের কারণ

এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, দিশেহারা ভোক্তা

নিরাপত্তার সমাধান, নাকি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ফাঁদ

মানবসংস্কৃতির শেষ আশ্রয় কোথায়

মাছ চাষে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান

মূল্যস্ফীতির চাপে সঞ্চয়ের পুরোনো শিক্ষা

প্রবাসে নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড ও রাষ্ট্রের করণীয়