দেড় বছর বাংলাদেশ কী করবে, কী করবে না, কী বলবে, কী বলবে না—এসব নিয়ে ছিল মহাবিপদের মুখে। হঠাৎ জানা গিয়েছিল রিসেট বাটন সেট করা হয়ে গেছে, এখন আমাদের আর ইতিহাস বা মুক্তিযুদ্ধের দরকার নেই! রিসেট বাটন সবকিছু মুছে দিতে নাকি যথেষ্ট। যা-ই হোক, সে বাটনে কাজ হয়নি। বাঙালি আবার পায়ে পায়ে ফিরছে, ফিরতে চাইছে তার শিকড়ের টানে।
কিন্তু মুশকিল হলো, আমরা সে জাতি, যারা এক পা এগোলে দুই পা পিছাই। এখন শুনছি শোভাযাত্রার নাম ‘মঙ্গল’ রাখা হবে না। শুনলাম এর নাম হবে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। আজ শুনলাম ‘আনন্দও’ চলবে না, এর নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। মঙ্গলের প্রতি রাগ বা বিদ্বেষের কারণগুলো শুনেছিলাম কিন্তু আনন্দের প্রতি বিরাগের কারণ এখনো জানা হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো বৈশাখের নামও পড়বে তোপের মুখে। থাকবে না বৈশাখের অস্তিত্ব। সে দুর্ভাবনা কখনো সার্থকতার মুখ না দেখুক।
বাংলা নববর্ষের জাতীয় উৎসবে পরিণত হওয়া খুব বেশি দিনের কথা নয়। ছেলেবেলায় চৈত্রসংক্রান্তি ছিল অনেক পদের রান্না ব্যঞ্জনের এক দিন। মা-খালারা বাবা বা অভিভাবকেরা বাজার করে আসার পরপরই রন্ধনে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। চৈত্র নিদাঘ গরমের মাস। এই ব্যঞ্জনের মূল পদগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে কেন এর প্রচলন। যত তিতা, যত শাক, যত তরকারি তার বেশির ভাগই মূলত গরম সহায়ক। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বাংলার মাটি ও ঐতিহ্য থেকে আহরিত শিবের গাজন। মুখোশের নাচ।
আমরা দেখতাম বহুরূপীরা এসব সাজে সেজে সন্ধ্যার পর বাড়ির উঠোনে উঠোনে নেচে বেড়াতেন। ঢাকঢোল আর বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাঁদের নাচ ছিল উৎসবের প্রস্তুতি। ওই দিন হালখাতা লেখার প্রচলন ছিল দোকানে দোকানে। দোকানিরা জিলাপি, বাতাসা, রসগোল্লার মতো মিষ্টি মজুত রাখতেন। যথাসম্ভব কাউকে ফেরাতেন না তাঁরা।
এখন সময় পাল্টে গেছে। চাইলেও আর আগের মতো সেসব নিয়ে মেতে ওঠা যাবে না। তা ছাড়া, সেই গাজন বা নাচের শরীরেও এসেছে পরিবর্তন। সেটা মানার পরও বিস্ময় মানি, কী কারণে হঠাৎ করে আমিষ ইলিশ দখল করে নিল বৈশাখের মূল জায়গা! পান্তাভাত আর ইলিশ সহযোগে বৈশাখ পালনের আজ যে সমারোহ, তার সঙ্গে অতীত বা ঐতিহ্যের কোনো মিল নেই। আমরা চিরকাল হুজুগে জাতি। যখন যেটা মাথায় ঢোকে, সেটা নিয়েই মেতে উঠি। পান্তা-ইলিশ এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে যে এটি না হলে নাকি পয়লা বৈশাখই হয় না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এই পান্তা-ইলিশ এখন দেশের বড় বড় হোটেল থেকে মেলার অনিবার্য অংশ। তার দাম, তার চাহিদা, তার সামাজিক স্ট্যাটাস এখন আকাশচুম্বী। আমি বিষয়টা নিয়ে বলছি এই কারণে, আজকের বাংলাদেশে যা কিছু ঘটছে, তার সবটাই প্রায় হুজুগ।
চোখ মেলে দেখুন, বাংলাদেশের নারীরা কি আগের মতো আছেন? একাত্তরে যে দেশের জন্ম, যে দেশের নারীরা খোলা চুলে কাঁধে বন্দুক নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছিলেন, আজ তাঁদের অনেকেই ঘর থেকে বের হতে চান না আর। সেটা কি আসলে ধর্ম, না কোনো বিশ্বাস? না মরুর হাওয়া? এই হাওয়ায় তাঁদের কাঁধের এককালের মুক্তির বন্দুক আজ হয়ে গেছে জঙ্গির হাতিয়ার! চিরকাল জেনে আসা মায়ার দেশ, মমতার সমাজে নারীরা ভবনের ভেতর থেকে আইনের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। লড়াই করেন এ দেশের নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে। কেন? তাঁরা এই কাল, ইহকাল বা আজকের কিছুতে বিশ্বাস করেন না। তাঁদের মগজে-মস্তিষ্কে পরকাল। যার সঙ্গে ধর্মের আসলে কোনো যোগ নেই। চিরকাল যে আলো আমাদের পথ দেখিয়েছে, যে ধর্ম আমাদের সাম্য ও মৈত্রীর বাণী শুনিয়ে মহান করে তুলেছিল, এরা তাকে বিতর্কিত করে ফেলছে। এ দেশের পানি, হাওয়া কিংবা সংস্কৃতি—কিছুতেই তাদের বিশ্বাস নেই। নেই বলেই এরা আমাদের জাতীয় পতাকা, গান, ভাস্কর্য—সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিতে চায়। যদি তা-ই হয় বা হতে থাকে, তাহলে কীভাবে পয়লা বৈশাখ নিরাপদ থাকবে দেশে?
পুরুষদের অন্তর আর বাইরে চলছে নিত্য দ্বন্দ্বের এক আশ্চর্য খেলা। তারা ভেতরে ভোগী, বাইরে সুশীল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কীটরা খুব ভালোভাবে জানে তারা এখানে কী করে। আজ দেশে যে পুরুষতন্ত্র দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, সমাজ শাসন করে, তাদের ভেতর বাঙালিয়ানা নেই বললেই চলে। হিল্লি-দিল্লি ঘুরে বেড়ানো এদের সঙ্গে বাঙালিয়ানার সম্পর্ক এখন শূন্যের কোঠায়। চারিত্রিক বিশৃঙ্খলা, বহুগামিতা আর বান্ধবীর নামে পরকীয়ার সমাজে একদিন সকালে নতুন পাঞ্জাবি বা পোশাক পরে ঘুরলেই বাঙালি হওয়া যায় না। তা-ও একবেলার জন্য। সকালের রোদ তেতে উঠতেই আমাদের আরেক চেহারা। সন্ধ্যা গড়াতে পানাহারে মত্ত আরেক বাঙালি জাতি আমরা। এই জাতি কী করে পয়লা বৈশাখের পতাকা বহন করবে?
যে কারণে আজকের সমাজে মঙ্গল শোভাযাত্রা পড়েছে চরম বিপাকে। কে না জানে বাংলাদেশে সব সময় খারাপ মানুষ ছিল এবং থাকবে? দুনিয়ার কোন দেশে তা নেই? উন্নত আধুনিক চরম উৎকর্ষে পৌঁছে যাওয়া সমাজেও খারাপ মানুষ আছে—যারা যৌনতা নিয়ে খেলে, নারীদের শরীর যাদের কাছে খেলার বিষয়। আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ঢুকে পড়া বদমানুষেরা কোন পেশার, কোন শ্রেণির বা কাদের ইন্ধনে এরা এসব করে, তা কমবেশি সবাই জানে। কিন্তু ঠেকানো যায় না। কারণ আমাদের ভেতরেই আছে তারা। এরা আমাদের ভেতর দিয়েই ঢুকে পড়ে। ধরা পড়লেও তাই বিচার হয় না। বিচার হলেও শাস্তি মেলে না। যাদের ওপর আমাদের গভীর বিশ্বাস, যারা মুক্তিযুদ্ধ ও চেতনার ধারক, তাদের আমলেও এরা নিরাপদ। এই ফাঁদে পড়া সমাজে মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন তোপের মুখে। ভাবখানা এমন, যেন নারীরা এই শোভাযাত্রা ছাড়া আর সব জায়গায় চরম নিরাপদে আছেন। বাসে, ট্রেনে, ঘরে, বাইরে অনিরাপদ নারীদের দিকে খেয়াল না রেখে কেবল শোভাযাত্রার ওপর এত আক্রোশের কারণ আসলে ভিন্ন।
যেভাবেই হোক, এতে এখন মুখোশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছে। মুখ ও মুখোশের সমাজে মুখোশ পরা মানুষ যে আসলে কারা, সেটাই বোঝা দায়। ধরে নিলাম এটা সাময়িক। কিন্তু এভাবে চললে আর কী কী বিষয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে, সেটা কি ভেবেছি আমরা? মূল ক্রোধ বা রাগের জায়গাটা কিন্তু পয়লা বৈশাখ। কারণ এটি বাংলাদেশ ও বাঙালির শক্তির উৎস। সে শক্তি কীভাবে কাজ করে সেটি আমরা আগে দেখেছি। এর প্রাণ যে সংস্কৃতি, সেটাই অন্ধ মানুষদের রাগের কারণ। তারা আমাদের সংস্কৃতিকে ভয় পায়। তারা জানে এই শক্তি একবার জাগলে তাকে ঠেকানো যায় না। এবং সেটাই এই জাতির মুক্তির উৎস।
পয়লা বৈশাখ বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব কি শুধু একদিন হইচই করার জন্য? একবেলা আনন্দ-ফুর্তি করে বাড়ি চলে গেলেই এই উৎসব আমাদের পথ দেখাবে? নাকি আমাদের উচিত এর দেখভাল করা? একসময় এই জাতি পয়লা বৈশাখের শক্তি ও সাহসে ভর করে বাঙালিকে মুক্ত করেছিল। পাকিস্তানের মতো দানবের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। সেই জাতি আজ কৃশ, আজ দোদুল্যমান। আজ তার ভেতরে-বাইরে দুশমন। তার চিন্তাচেতনায়, মাথায় ঢুকে আছে বিদেশি ভূত। পরজাতির সংস্কৃতি। মূলত বাংলাদেশ ও বাঙালিকে পেছনে টেনে রাখার চক্রান্তমুক্ত পয়লা বৈশাখ না পেলে একদিন এর বলহীন উদ্যাপনে মগ্ন জাতিকে দেখে করুণা করার বিকল্প থাকবে না।
পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ আমাদের সেই শক্তির আধার, যা চিরকালের। তাকে যেন হারিয়ে যেতে না দিই। শুভ নববর্ষে সবার জীবন বাঙালিয়ানায় ভরে উঠুক।
লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট