এবার দেবী দুর্গা ঘোটকে আগমন করেন, যা শাস্ত্রমতে যুদ্ধের ইঙ্গিত (ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে), রাজনৈতিক অস্থিরতার আভাস দেয়। এবং নৌকায় দেবীর গমন—যার ফল হলো শস্যবৃদ্ধি বা জলবৃদ্ধি তথা অতিবৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কার (শস্যবৃদ্ধিস্তুথাজলম) মাঝেও শস্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে দেবী দেশের জন্য শুভ কিছু বার্তা নিয়ে এসেছেন।
দেশের মানুষের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের সুন্দর বহিঃপ্রকাশ সনাতনী সম্প্রদায়ের তথা বাঙালিদের বড় উৎসব এই দুর্গাপূজা, যা ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের মধ্যে যে উৎসবের আমেজ তৈরি করেছে, তাতে কিছুদিনের জন্য হলেও রাজনৈতিক চাপান-উতোরকে ছাপিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তম্ভের প্রধানদের উপস্থিতি বিভিন্ন জেলায় মানুষের মধ্যে এক নতুন পরিশীলিত ও সুন্দর ভ্রাতৃত্ববোধের সূচনা করেছে। বললে অত্যুক্তি হবে না, এবারের ২০২৬ সালের দুর্গাপূজা অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে কিছুটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয়।
বিভিন্ন সরকারের আমলে সনাতনীদের আবেদনে নির্বাহী আদেশে, এবার দুর্গাপূজার ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন (দশমীর ছুটিসহ) করা হয়, যার ফলে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে মানুষ টানা পাঁচ দিনের লম্বা ছুটি উপভোগ করে। তবে এই ছুটিকে স্থায়ী করার আহ্বানও জানানো হয়। পূজার সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। সরকার আগামীবার এই অনুদান আরও বাড়াবে বলে পূজার আয়োজকদের বিশ্বাস।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সনাতনীসহ সবার অংশগ্রহণ সরকারকে একটি সুন্দর দেশ গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। দেশ গড়ার প্রত্যয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই উৎসব চলাকালীন দেশের বিভিন্ন জেলা (রংপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম) সফর করেন এবং মণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে ঘোষণা দেন যে বাংলাদেশে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তিনি মণ্ডপ পরিদর্শন করে জোরালো বার্তা দেন যে দেশে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু বলে কিছু নেই, পরিচয়ের দিক থেকে সবাই বাংলাদেশি।
এবারের বাংলাদেশের পূজা পার্শ্ববর্তী কলকাতার পূজার চেয়ে জমজমাট হয়েছে বলে কলকাতার সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পূজার বৈচিত্র্য, পূজার মাধ্যমে সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সামাজিক বার্তা সমাজে আলো আনবে বলে সাধারণের বিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম আগমন পূজার রাষ্ট্রীয় আমেজ বাড়িয়েছে।
বিজয়া দশমীতে শান্তিজল গ্রহণ এবং প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো এবারের উৎসব। এই পূজা প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের সব সাধারণ মানুষের ইচ্ছায় বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই এত বড় উৎসব সম্পন্ন করা সম্ভব।
দুর্গাপূজা সুন্দরভাবে সমাপনের পাশাপাশি সনাতনী সম্প্রদায় সরকারের কাছে বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি ও তাৎক্ষণিক দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে। সেগুলোর মধ্যে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও মন্ত্রণালয়, চলমান ও বিভিন্ন সময়ে তাদের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি উল্লেখযোগ্য।
এবার শারদীয় দুর্গাপূজা আনন্দ-উৎসবে শেষ হলো। এখন সরকারের কাছে এটাই প্রত্যাশা যে এই সব দাবি দ্রুত পূরণ করা হবে।