বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানের পরও থামছে না মাদকের অনুপ্রবেশ। দুর্গম পাহাড়, নদী ও সাগরপথের সুযোগ নিয়ে সীমান্তের অন্তত ২২টি রুট দিয়ে ঢুকছে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক জব্দ অভিযানের পরও এসব মাদক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমার সীমান্ত সুরক্ষায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
আজ ২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস। মাদকের বিস্তার রোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বানের মধ্যে দেশের সীমান্ত দিয়ে অব্যাহত রয়েছে মাদক পাচার।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই দশক ধরে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে ভয়ংকর মাদক ইয়াবা পাচার হয়ে আসার ঘটনা বেড়েছে। সীমান্তের অন্তত ২২টি রুটে আইস ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক ঢুকছে। কক্সবাজার থেকে এসব মাদকের চালান সড়ক, রেল, আকাশ ও নৌপথে চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বিদ্রোহীগোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে যুদ্ধ চলছে। এর মধ্যে আরাকান আর্মি রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে অধিকাংশ দখলে নিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে থাকা সীমান্তও দেড় বছর ধরে পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে।
সীমান্তের দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, রাখাইনের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা উৎপাদনের শতাধিক ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশকে টার্গেট করে। আগে মাদক পাচারে জান্তা বাহিনীর সহযোগিতা থাকলেও এখন সেই পথ অনুসরণ করছে আরাকান আর্মি। আরাকান আর্মি মাদক বিক্রি করে অস্ত্র ও রসদ জোগাড় করছে। তাদের সহায়তায় দুই দেশের পাচারকারীর রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটে স্থানীয় রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
মাদকপাচার বন্ধে দায়িত্বপ্রাপ্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ইয়াবা কেলেংকারিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি কক্সবাজার আদালতের এক বিচারকের গানম্যান পুলিশ কনস্টেবল ইমতিয়াজ ৮০ হাজার ইয়াবা নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে আটক হন। উদ্ধার হওয়া ইয়াবা বাকলিয়া থানার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা আত্মসাৎ করেছে বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। এর আগে কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের বিরুদ্ধে ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন সময়ে পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থার সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক পাচারে জড়িত থাকায় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
মাদক পাচার বন্ধে ২০১৮ সালে দেশব্যাপী অভিযান শুরু করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই অভিযানে সাড়ে তিন বছরে কক্সবাজারেই ২৯৯ জন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। এ ঘটনার সিংহভাগ টেকনাফ ও উখিয়ায়। এরপরও ঠেকানো যায়নি মাদক পাচার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী আইনশৃঙ্খলার ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে ইয়াবার স্রোত আরও বেড়ে যায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ১৫ সংস্থার সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে।
এই টাস্কফোর্সের সদস্যসচিব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, ‘বিভিন্ন সংস্থায় মাদককারবারিদের তালিকা রয়েছে। সে তালিকা তিন মাস পরপর হালনাগাদ করা হয়। স্ব-স্ব সংস্থা তালিকা ধরেই অভিযান পরিচালনা করছে।’
কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্যমতে, জেলায় ২০২৫ সালে ২ কোটি ৭৬ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৬টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় ২ হাজার ২৭৭ জনকে। মামলা হয় ১ হাজার ৬৮৭টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ ১৭ হাজার ২৯৩টি। এ সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে ৮৯২ জন। মামলা হয়েছে ৭০১টি। তবে গত দেড় বছরে আইস পাচারের হার কমে এসেছে।
মাদক পাচারে জড়িত বাহক প্রায় সময় আটক হচ্ছে জানিয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) মো. অহিদুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেকোনো মূল্যে মাদক ঠেকাতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এর মধ্যে মাদকের অর্থ জোগানদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কাজ শুরু হয়েছে।’ পাশাপাশি মাদক প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
গত বুধবার কক্সবাজার-৪ (উখিয়া ও টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী সংসদ অধিবেশনের বাজেট আলোচনায় মাদক পাচারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রোহিঙ্গাদের কারণে মাদক পাচার বেড়েছে জানিয়ে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
গত ১৪ এপ্রিল টেকনাফ সফরে গিয়ে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া ও পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশকে মাদকমুক্ত করতে শিগগির দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘মাদক পাচারে টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজার অঞ্চলকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চিহ্নিত পয়েন্টগুলোতে দ্রুত পরিকল্পিতভাবে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
এ ছাড়া গত ১৭ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদ অধিবেশনের বাজেট আলোচনায় মিয়ানমার সীমান্ত সুরক্ষায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান।