আরেকটি হত্যা মামলায় ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আবারও ৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আজ সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস তাকে রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার মিরপুর-১০ এলাকায় বিপ্লব শেখ নামের এক যুবককে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আলোচিত এই সেনা কর্মকর্তাকে প্রথমে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জুলাই আন্দোলনের সময় দেলোয়ার হোসেনকে হত্যার ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় দায়ের মামলায় ৩ দিনের রিমান্ড শেষে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আজ আদালতে হাজির করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির এসআই কফিল উদ্দিন তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। শুনানি শেষে ওই মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
পরে মিরপুর থানার বিপ্লব শেখ হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের মিরপুর জোনাল টিমের এসআই হাবিব উল্যাহ্। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে তাঁর আইনজীবী উম্মে হাবিবা রিমান্ড বাতিল করে জামিন প্রার্থনা করেন। শুনানি শেষে আদালত ৩ দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, জুলাই আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টায় মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের পাশে আজমল হাসপাতালের সামনে ছাত্র-জনতার মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন বিপ্লব শেখ (১৯)। এ সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। তাকে স্থানীয় লোকজন আজমল হাসপাতালে ভর্তি করেন। ওই দিন রাত ১১টার দিকে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১ জুলাই শেখ হাসিনাসহ সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, পুলিশ কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় মামলা হয়।
গত ২৩ মার্চ গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার ২ নম্বর লেনের ১৫৩ নম্বর বাড়ি থেকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। ২৯ মার্চ একই মামলায় তাঁকে দ্বিতীয় দফায় ৬ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গত ৪ এপ্রিল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে একই মামলায় ৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এরপর মিরপুর থানায় দায়ের দেলোয়ার হত্যা মামলায় তাঁকে ৪ দফা রিমান্ডে নেওয়া হয়। এবার বিপ্লব শেখ হত্যা মামলায় ৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হলো তাঁকে।
শুনানি যা বললেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী
বিপ্লব শেখ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনের শুনানি হয় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে। মাসুদ উদ্দিনকে আদালতে হাজির করার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ শুনানিতে বলেন, ‘তিনি (মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী) জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য। এর চেয়ে বড় পরিচয় তিনি ১/১১-এর একজন কুশীলব। বিপ্লব শেখ হত্যা মামলায় তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এ জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে।’
এ সময় বিচারক মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কাছে জানতে চান, ‘আপনি এমপি ছিলেন?’ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জবাবে বলেন, ‘হ্যাঁ’। বিচারক বলেন, ‘নির্বাচিত?’ জবাবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘অবশ্যই’। কোন আসন থেকে নির্বাচিত- বিচারকের প্রশ্নে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ফেনী-৩ আসন থেকে।’
বিচারক কত সালের নির্বাচনে জানতে চাইলে মাসুদ উদ্দিন বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনে।’ নিজে কিছু বলতে চান কি না- বিচারক জানতে চাইলে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘একই দিনের একই সময় আরেক মামলায় ১৫ দিনের রিমান্ডে ছিলাম। একদিনে একই সময়ে কীভাবে দুই হত্যার নেতৃত্বে ছিলাম?’
তখন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ বলেন, ‘ঘটনা ভিন্ন। একেকজন একেকভাবে হত্যায় জড়িত।’’
এজাহারে নাম ছিল কি না- মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জানতে চাইলে বিচারক জানান, কোনো মামলার এজাহারে নাম ছিল না। পরে আদালত তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। আদেশ শুনে বিচারককে ধন্যবাদ দেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
এরপর রিমান্ড বিষয়ে শুনানি করতে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে নেওয়া হয় আরেক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘এই আসামি ১/১১-এর একজন খলনায়ক। ১/১১-এর সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। বিএনপির প্রধান দুই চরিত্র খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে দল থেকে সরে যেতে চাপ দেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেন। ওই সময় একটা পাতানো নির্বাচন করে হাসিনাকে ক্ষমতায় আনেন।’ তিনি বলেন, ‘মামলাটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলা। তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাকে রিমান্ডে নিলে মামলার তথ্য উদ্ঘাটিত হবে।’
মাসুদ উদ্দিনের আইনজীবী বলেন, তিনি একজন সাবেক সংসদ সদস্য। অন্যান্য মামলায় তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সত্তরোর্ধ্ব বয়স্ক একজন মানুষ। এজাহার, এফআইআরে তাঁর নাম নেই। রিমান্ডে নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি জামিনে মুক্তি পেতে পারেন।
এ পর্যায়ে আদালতের কাছে কথা বলার অনুমতি চান মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তবে কথা বলার অনুমতি পাননি তিনি। পরে আদালত ৩ দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন।