আনুমানিক ২ ফুট দৈর্ঘ্য, ৩ ফুট প্রস্থ ও প্রায় আড়াই ফুট উচ্চতার একটি কক্ষ। আলো-বাতাস চলাচলের সুবিধাহীন কক্ষটিতে কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সোজা হয়ে দাঁড়ানো বা শোয়া অসম্ভব। ওই কক্ষেরই এক পাশে টয়লেটের ব্যবস্থা। আর পাঁচটি কক্ষের আনুমানিক দৈর্ঘ্য ২ ফুট, প্রস্থ ৪ ফুট ও উচ্চতা প্রায় সাড়ে ৪ ফুট। এগুলোরও এক পাশে টয়লেটের ব্যবস্থা।
রাজধানীর উত্তরায় র্যাব-১ সদর দপ্তরে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলের নিচতলায় এমন ছয়টি কক্ষ দেখেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর তিন বিচারক, প্রসিকিউশন দল, তদন্ত কর্মকর্তা ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাব পরিচালিত ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত গোপন বন্দিশালা গতকাল শনিবার পরিদর্শন করেন তাঁরা।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি এবং গণমাধ্যমকর্মীরাও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তা ওই কক্ষগুলোকে উল্লেখ করেন, ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’ বা ‘কবর সেল’ হিসেবে।
পরিদর্শনকালে দ্বিতীয় তলায় একটি অংশে আনুমানিক ১৪ ফুট দৈর্ঘ্য, ৪-৫ ফুট প্রস্থ ও স্বাভাবিক উচ্চতার ১০টি সেল দেখা যায়। অপর অংশে দুটি বড় সেল, যেগুলোকে তথাকথিত ভিআইপি সেল বলা হতো। এর একটির আনুমানিক দৈর্ঘ্য ১৪ ফুট ও প্রস্থ ১০ ফুট। অপরটির দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১০ ফুট ও প্রস্থ ১০ ফুট। এগুলোর সঙ্গে একপাশে টয়লেট। দ্বিতীয় তলায় টিএফআই সেল এবং র্যাবের গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তাদের বেশ কয়েকটি অফিসকক্ষ। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রয়েছে সাউন্ডপ্রুফ তিনটি বিশেষ কক্ষ।
দোতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ওঠার আগে মাঝখানে ডান দিকে রয়েছে ছোট ১০টি কক্ষ। স্বাভাবিক উচ্চতার এই কক্ষগুলোর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮ ফুট ও প্রস্থ ৫ ফুট। কক্ষের ভেতরে একপাশে টয়লেটের ব্যবস্থা। নিচতলায় একটি অংশে সৈনিক ব্যারাকের মতো স্থাপনা রয়েছে, যেখানে টিএফআই সেলের প্রহরী র্যাব সদস্যরা থাকতেন।
প্রসিকিউশন দলের সদস্যরা জানান, এই ‘আয়নাঘরে’ রাখা ভুক্তভোগীদের ‘সাবজেক্ট’ নামে ডাকা হতো। এখানে নির্যাতনের জন্য বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে ছিল ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার। যাতে বন্দীদের বসিয়ে ইলেকট্রিক মোটর চালু করে প্রচণ্ড গতিতে ঘোরানো হতো। ছিল বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার এবং বন্দীদের ছাদ থেকে ঝোলানোর বিশেষ ব্যবস্থা। একটি মইসদৃশ্য লোহার বেডে বন্দীদের বেঁধে বিভিন্ন কায়দায় নির্যাতন করা হতো। অনেক সময় হালকা গতিতে ঘড়ির কাঁটার মতো ঘুরিয়ে তাঁদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হতো। এ ছাড়া ভয় দেখানোর জন্য জিজ্ঞাসাবাদকক্ষে কাটা হাত, চোখ উপড়ে ফেলা মানুষের ছবিসহ নির্যাতনের শিকার মানুষের বীভৎস ছবি টাঙিয়ে রাখা হতো।
পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সেখানে ২৯টি কক্ষ রয়েছে। নিচে অত্যন্ত ছোট ও সংকীর্ণ ৬টি কক্ষ রয়েছে, যেখানে একজন স্বাভাবিক মানুষের লম্বা হয়ে শোয়ারও সুযোগ নেই। এসব কক্ষে মানুষকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর হাত-চোখ বেঁধে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো।
আমিনুল ইসলাম বলেন, গুমের শিকার বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ ও ব্যারিস্টার আরমান এখানে ছিলেন। কাউকে দীর্ঘদিন পর বিভিন্ন মামলায় ছেড়ে দেওয়া হলেও অনেককে হত্যা করা হয়েছে। ইলিয়াস আলীসহ গুমের শিকার আড়াই শতাধিক মানুষের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। যারা এই আয়নাঘরের বিভিন্ন কক্ষের সামনে দেয়াল তুলে আলামত গোপনের চেষ্টা করেছিল, তাদের ভূমিকাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।